# শেষ দিকে বেচাকেনা জমে ওঠার আশা
# ক্রেতারা আসছেন বাজার যাচাই করতে
বিজ্ঞাপন
# মাঝারি গরুর দামে বড় পার্থক্য দেখছেন ক্রেতারা
# রাজধানীতে এবার বসছে ২৪টি পশুর হাট
# প্রবেশমুখে জায়গা পেতে নীরব প্রতিযোগিতা
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে কোরবানির পশু আসতে শুরু করেছে পুরোদমে। ট্রাকভর্তি গরু, মহিষ ও ছাগল নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসছেন খামারি ও বেপারিরা। তবে পশুর সরবরাহ বাড়লেও এখনো জমে ওঠেনি রাজধানীর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী গাবতলী পশুর হাট। হাটজুড়ে এখন বিক্রেতাদের ব্যস্ততা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না থাকায় দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে খামারি ও ব্যাপারিদের।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিন শুক্রবার (২২ মে) গাবতলী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন অংশে সারি করে বাঁধা রয়েছে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের গরু। কোথাও ট্রাক থেকে পশু নামানো হচ্ছে, কোথাও আবার বাঁশ-খুঁটি পুঁতে অস্থায়ী ঘেরা তৈরির কাজ চলছে। বিশাল শামিয়ানার নিচে গরুগুলোকে বিশ্রাম দিতে ব্যস্ত খামারিরা। কেউ খড় দিচ্ছেন, কেউ পানি খাওয়াচ্ছেন। আবার কেউ গরুর শরীরে পানি ঢেলে গরম কমানোর চেষ্টা করছেন। হাটের এক পাশে নতুন ট্রাক এসে থামছে, অন্য পাশে বিক্রেতারা নিজেদের জায়গা গোছাতে ব্যস্ত। চারদিকে কোরবানির প্রস্তুতির ব্যস্ততা থাকলেও সেই তুলনায় ক্রেতাদের উপস্থিতি অনেক কম।
হাট ঘুরে দেখা যায়, ভালো জায়গা দখল করাকে কেন্দ্র করে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। প্রবেশমুখ বা সামনের সারিতে জায়গা পেলে ক্রেতাদের নজরে আগে পড়া যায় বলে মনে করছেন তারা। তাই অনেকে আগেভাগেই এসে জায়গা নিশ্চিত করছেন। কেউ বাঁশ দিয়ে ঘেরা তৈরি করছেন, কেউ গরুর জন্য আলাদা ছাউনি বানাচ্ছেন। আবার কেউ নিজেদের জায়গা বড় করার চেষ্টা করছেন।
হাটে আসা বেশির ভাগ মানুষই ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু কিনছেন না। অনেক বিক্রেতাই সকাল থেকে একটি পশুও বিক্রি করতে পারেননি। এতে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
গাবতলী হাটে কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে দুটি গরু নিয়ে এসেছেন মো. ইদবার। তিনি সাথে নিয়ে এসেছে ৯টি গরু। নিজের গরুর পাশে বসে তিনি বলেন, তিনি প্রায় সারা বছর ধরে গরু দুটি লালন-পালন করেছেন। এবার কোরবানির ঈদে ভালো দামে বিক্রি হবে, এমন আশা নিয়েই ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু হাটে এসে তিনি এখনো আশানুরূপ ক্রেতা পাচ্ছেন না। অনেকে এসে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, ছবি তুলছেন, কিন্তু কেনার মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তিনি জানান, দুটি গরুর জন্য প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন। খাবার, চিকিৎসা ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে এবার তার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এখন ভালো দাম না পেলে লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানোও কঠিন হয়ে যাবে।
একই জেলার আরেক বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, তিনি শতাধিক গরু নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, হাটে এখনো সেই জমজমাট পরিবেশ তৈরি হয়নি। যারা আসছেন, তারা মূলত বাজার পরিস্থিতি বুঝতে আসছেন। কেউ এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। প্রতিবছর ঈদের আগের কয়েক দিনে হাটে প্রচুর ভিড় হয়। তখন দরদামও দ্রুত হয়। এবারও সেই আশাতেই অপেক্ষা করছেন। তবে পরিবহন খরচ বাড়ায় শুরু থেকেই চাপের মধ্যে আছেন তারা।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ৬০টি গরু নিয়ে এসেছেন মোমিন বিশ্বাস (ব্যাপারী)। তিনি বলেন, প্রতি বছরই গাবতলী হাটে গরু নিয়ে আসেন। এবারও অনেক আশা নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখনো বেচাকেনা শুরু না হওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি জানান, দূর পথ থেকে গরু আনা সহজ নয়। ট্রাক ভাড়া, শ্রমিক খরচ, পশুখাদ্য—সবকিছুর দাম বেড়েছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত ভালো বিক্রি হবে, এমন আশা নিয়েই হাটে আছি। রাজধানীর মানুষ সাধারণত শেষ দুই দিনে বেশি গরু কেনেন। তাই এখনো অপেক্ষার মধ্যেই আছি।
জামালপুর থেকে প্রায় ৮০টি গরু নিয়ে এসেছেন খামারি জাকারিয়া। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গরুগুলোকে প্রস্তুত করেছেন। অনেক যত্ন নিয়ে পালন করেছেন। কিন্তু হাটে এসে এখনো তেমন ক্রেতা দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে হাটেই থাকতে হচ্ছে। গরুর দেখাশোনা, খাবার দেওয়া, পরিষ্কার রাখা—সবকিছু সামলাতে হচ্ছে। অথচ বিক্রি না হওয়ায় মানসিক চাপ বাড়ছে। এখন শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। শেষের দিকে হয়তো ক্রেতা বাড়বে এবং বাজার জমে উঠবে।
রাজশাহী থেকে আসা খামারি আব্দুল জলিল বলেন, ভালো জায়গা না পেলে গরু বিক্রি কম হয়। তাই অনেক আগেই এসে জায়গা নিশ্চিত করতে হয়েছে। এবার গরু পালনে খরচ অনেক বেড়েছে। ভুসি, খৈল, খড়, ঘাস সবকিছুর দাম আগের চেয়ে বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খরচ। এত খরচের পর যদি কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া যায়, তাহলে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে। তারপরও দেশীয় খামারিদের ওপর মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
ফরিদপুরের ব্যাপারী আবু বকর বলেন, পাবনা থেকে গরু কিনে এনে দুই দিন ধরে হাটে বসে আছেন। কিন্তু এখনো একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি। তিনি বলেন, অন্য বছর এই সময়ের মধ্যে কয়েকটি গরু বিক্রি হয়ে যেত। এবার সেই পরিবেশ নেই। ক্রেতারা এসে দাম শুনে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় আছেন।
আবু বকর বলেন, ঢাকার মানুষ আগে পশু কিনে রাখতে চান না। জায়গার সংকট ও দেখাশোনার সমস্যার কারণে তারা ঈদের এক বা দুই দিন আগে পশু কেনেন। তাই এখনো বাজার পুরোপুরি জমে ওঠেনি।
ক্রেতারাও এখনই পশু কিনতে খুব একটা আগ্রহী নন। অনেকেই বলছেন, রাজধানীতে আগে গরু কিনে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই শেষ মুহূর্তেই পশু কেনার পরিকল্পনা করছেন তারা।
মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন চাকরিজীবী বিদ্যুৎ হোসেন। তিনি বলেন, এখন শুধু বাজার দেখছি আর এবং দামের ধারণা নিচ্ছি। তবে এখনই কেনার পরিকল্পনা নেই। তিনি জানান, শেষের দিকে অনেক সময় দরদাম কিছুটা কমে আসে। তাই অপেক্ষা করবো। তবে এবার গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।
আরেক ক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, মাঝারি আকারের গরুর দামও এবার অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে। একটি গরুর জন্য ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দাম চাওয়া হয়েছে, অথচ তার বাজেট ১ লাখ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে পছন্দ হলেও কিনতে পারছেন না।
ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে হাটে এসেছেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গরু দেখতে এসেছেন। কয়েকটি গরু পছন্দও হয়েছে। কিন্তু এখন কিনলে রাখার সমস্যা হবে। আমাদের শহরে গরু রাখার জন্য আলাদা জায়গা নেই। তাই ঈদের আগের দিন বা তার আগের দিন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাধারণত রাজধানীর মানুষ ঈদের এক বা দুই দিন আগে পশু কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ শহরে পশু রাখার জন্য আলাদা জায়গা ও পরিচর্যার সমস্যা থাকে। তাই মূল বেচাকেনা শুরু হয় শেষ মুহূর্তে।
এবার গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন হানিফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হানিফ। ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকায় তিনি হাটটির ইজারা নেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাকে পাওয়া না গেলেও তার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নিজাম বলেন, তিন দিন ধরে পশু উঠছে। এখন পর্যন্ত ৪৫ থেকে ৫০টির মতো পশু বিক্রি হয়েছে। তবে মূল বেচাকেনা শুরু হবে রোববারের পর থেকে। এবার গত বছরের তুলনায় পশুর সরবরাহ বেশি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়মিত পশু আসছে। হাট ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রাজধানীতে এবার গাবতলীর স্থায়ী হাটসহ মোট ২৪টি পশুর হাট বসছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। তবে এর বাইরে রয়েছে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, পশুর হাট পরিচালনায় শর্ত ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি হাটের জন্য প্রায় ৩৯টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট বিস্তার করলে বা যানজট সৃষ্টি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পশুর হাটে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও জনভোগান্তি কমাতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে হাইওয়ে সড়কে বা সড়কের পাশে কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। গরুর ট্রাক চলাচলেও বিশেষ নজরদারি থাকবে। ঈদের সময় ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ধোলাইপাড়, আব্দুল্লাহপুর ও গাবতলী এলাকায় সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এএইচ/জেবি




