বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে তীব্র বিরোধিতা ভোক্তাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে তীব্র বিরোধিতা ভোক্তাদের

পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এক টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিল্প উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠনের নেতারা। 

তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে এবং শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।


বিজ্ঞাপন


বুধবার (২০ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনে এসব বক্তব্য উঠে আসে। শুনানিতে বিপিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করে।

এ ছাড়া দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিও খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জমা দিয়েছে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার পৃথক শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

শুনানিতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে বিইআরসি জনগণের কাছে ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। তিনি বলেন, সরকার জনগণের টাকাতেই ভর্তুকি দেয়, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

সৈয়দ মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে অনেক বেআইনি কাজ হয়েছে এবং তাতে বিইআরসিও সহযোগিতা করেছে। তার ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে জনগণের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে শিল্প উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। একসময় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই অবস্থান করলেও ধীরে ধীরে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন কোনোভাবেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বিপিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং গণশুনানি বাতিলের দাবি জানান।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বর্তমান আইনে বিইআরসি শুধু দাম বাড়ানোর সুপারিশ নিয়েই শুনানি করতে পারে, কিন্তু দাম কমানোর বিষয়ে শুনানির সুযোগ নেই। তাই জনগণের স্বার্থে বিইআরসি আইন সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছিল। এরপর গত দুই বছরে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। তবে দেশীয় উৎপাদনেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ খাতেও পড়ছে।

বিপিডিবি চেয়ারম্যান জানান, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। প্রস্তাবিত মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরো ঘাটতি পূরণ নয়, বরং ভর্তুকির একটি অংশ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ না থাকলেও অভিযোগ আসে। তাই উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান নীতিমালায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হতে পারলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপও হ্রাস পাবে।

এএইচ/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর