বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিদেশে বিপনিবিতানেই বাংলাদেশিদের খরচ ১৫১ কোটি!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ১১:০৩ এএম

শেয়ার করুন:

বিদেশে বিপনি-বিতানেই বাংলাদেশিদের খরচ ১৫১ কোটি!
বিদেশে বিপনি-বিতানেই বাংলাদেশিদের খরচ ১৫১ কোটি!
  • ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে এক মাসের ব্যবধানে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি
  • দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ৪ হাজার ৩৪২ কোটি
  • দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের খরচ ৪৭০ কোটি
  • সবচেয়ে বেশি খরচ যুক্তরাষ্ট্রে
  • দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই ভিসা কার্ডের আধিপত্য
  • ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে দেশের ৪৭টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান

দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণ, অনলাইন কেনাকাটা, আন্তর্জাতিক সেবা গ্রহণ এবং ক্যাশলেস লেনদেনের প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে গত কয়েক বছরে ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশে ৪ হাজার ৩৪২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এছাড়াও দেশের বাইরে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট ৪৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এর মধ্যে শুধু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা বিপনি বিতানেই ব্যয় হয়েছে ১৫১ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা বিদেশে মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে ভ্রমণ, শপিং ও ব্যক্তিগত কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ার কারণে এই খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।


বিজ্ঞাপন


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৪২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা মার্চে বেড়ে ৪ হাজার ৩৪২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে বিদেশে ব্যয় ফেব্রুয়ারির ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ টাকা থেকে মার্চে বেড়ে হয়েছে ৪৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা বড় বিপনি বিতানে। মার্চ মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৫১ কোটি ১০ লাখ টাকা। বিদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া পরিবহন খাতে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে বিমান টিকিট, রাইড শেয়ারিং, গণপরিবহন ও ট্রাভেল সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ওষুধ ও ফার্মেসি খাতে বিদেশে ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যবসায়িক সেবায় ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বিদেশে পোশাক খাতে খরচ হয়েছে ৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পেশাগত সেবায় ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিদেশে নগদ অর্থ উত্তোলনে ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সরকারি সেবায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ইউটিলিটি খাতে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

credit-card

তথ্য বলছে, দেশভিত্তিক হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও কেনাকাটার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের ব্যয় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এরপরই রয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটিতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। চিকিৎসা ও পর্যটন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে থাইল্যান্ডে কার্ড ব্যবহার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। সৌদি আরবে ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। ওমরাহ ও অন্যান্য ধর্মীয় সফর ছাড়াও সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন ব্যয় এই লেনদেন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


সিঙ্গাপুরে ৪১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং যুক্তরাজ্যে ৪০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া ভারতে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ৩৫ কোটি টাকা, নেদারল্যান্ডসে ২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, আয়ারল্যান্ডে ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা, কানাডায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং চীনে ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনেও সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মার্চ মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সুপারশপ, বড় বিপণিবিতান ও চেইন রিটেইল স্টোরে নগদবিহীন কেনাকাটা বাড়ার কারণে এই খাতে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের ভেতরে পোশাকের দোকানে ব্যয় হয়েছে ৫৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে ৪৮৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩৬০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

credit-card2

এছাড়া নগদ অর্থ উত্তোলনে ২৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ওষুধ ও ফার্মেসিতে ২১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সরকারি সেবায় ১৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পরিবহন খাতে ব্যয় হয়েছে ১১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ব্যবসায়িক সেবায় ১০২ কোটি ১০ লাখ টাকা, তহবিল স্থানান্তরে ৭২ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পেশাগত সেবায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

তথ্য বলছে, দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই ভিসা কার্ডের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। মার্চ মাসে দেশের ভেতরে ভিসা কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২০২ কোটি ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৭০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বিদেশেও ভিসা কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে সবচেয়ে বেশি—৩৫০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সহজ ব্যবহারের কারণে ভিসা কার্ডের ব্যবহার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৪৭টি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিতরণযোগ্য ঋণের মোট অনুমোদিত সীমা ছিল ৪১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। বর্তমানে বাজারে মোট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৭ লাখ ৮ হাজার ২৮৫টি। শুধু মার্চ মাসেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৫৯টি।

credit_card4

ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৮৬টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যাদের কার্ড সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪টি। এরপর রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ই-কমার্সের বিস্তার, বিদেশ ভ্রমণ বৃদ্ধি, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন সেবা এবং নগদবিহীন লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তাদের মতে, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়া অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক লেনদেন বৃদ্ধিরও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে একই সঙ্গে বকেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং ব্যাংকগুলোর তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর