অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন সংকট আরো গভীর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ২০টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতির কারণে আগের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কমেছে এ ঘাটতি। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ডিসেম্বর শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বেসরকারি সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি, এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো হওয়ায় প্রভিশনের চাপ কমেছে। ফলে সাময়িকভাবে মূলধন ঘাটতিও কিছুটা কমেছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, শুধু পুনঃতফসিল করে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল সুশাসন এবং খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান মূলধন সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টিএই/এফএ




