বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘তামাকপণ্যের বর্তমান কর কাঠামোয় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘তামাকপণ্যের বর্তমান কর কাঠামোয় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে’
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বক্তারা। ছবি: সংগৃহীত

তামাকপণ্যের বর্তমান কর কাঠামোর কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রথম সচিব (ভ্যাট মনিটরিং ও আইটি) নাহিদ নওশাদ মুকুল। তিনি বলেন, কার্যকর তামাক কর বাস্তবায়ন করা গেলে ধূমপান কমবে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে এবং সরকারের আয়ও বাড়বে।

বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কার্যকরভাবে সব তামাকপণ্যের কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পুওর-ডব্লিউবি।


বিজ্ঞাপন


সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় তামাকপণ্য এখনও অনেক সস্তা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চিনি, আলু, আটা, ডিম ও সয়াবিন তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ২৭ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ।

তিনি বলেন, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতার কারণে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি হারে মূল্য বাড়ানো প্রয়োজন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ—এই চার স্তরের সিগারেট বিদ্যমান। এর মধ্যে বাজারে বিক্রি হওয়া সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের, যা সহজলভ্য হওয়ায় যুবসমাজ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে দ্রুত আসক্ত করে তুলছে। তাই আসন্ন অর্থবছরে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা ও অতি উচ্চ স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে। তামাকপণ্যে এই কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।


বিজ্ঞাপন


জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি (৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ) এবং তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। ২০২৪ সালে তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। কার্যকর করারোপের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ফিলিপাইন, তুরস্ক, মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ফিলিপাইনে সিন ট্যাক্স সংস্কারের মাধ্যমে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি ও একক কর কাঠামো চালুর ফলে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিগারেট বিক্রি ২৮ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায় এবং রাজস্ব তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পায়।

একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় কার্যকর তামাক কর বৃদ্ধির ফলে ধূমপান কমার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তামাক খাতকে শুধু রাজস্ব আয়ের চশমা দিয়ে না দেখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর করনীতি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডব্লিউবির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান। সমাপনী বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং সঞ্চালনা করেন উপনির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ডব্লিউবি তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রতিনিধি জেবা আফরোজা ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।

বিইউ/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর