জ্বালানি তেলের জন্য চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে চলছে হাহাকার ও দুর্ভোগ। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে ক্রুড অয়েল আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় ডিজেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও মজুত গড়িয়ে পড়ছে পেট্রোল ও অকটেন।
ফলে উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পেট্রোল ও অকটনে নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিপিসির এই কথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বাস্তবতার। কারণ চট্টগ্রামে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। রেশনিং করা তেল নিতে ৭ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রোববার (১৯ এপ্রিল) পর্যন্ত অদ্যাবধি চরম এ বাস্তবতা আঠার মতো লেগে আছে চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে। কোনো কোনো পাম্পে তো তেল নেই বলে ফটকে বাঁশের অস্থায়ী গেট দিয়ে নীরবতা পালন করছে। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন যানবাহন চালকরা।
একাধিক যানবাহন চালকের ভাষ্য, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪১টির মতো পেট্রোল পাম্প রয়েছে। তন্মধ্যে অর্ধেক পেট্রোল পাম্প তেল বিক্রি করছে না। তেল নেই লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী গেট দিয়ে পাম্পের ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাকি অর্ধেক পাম্পে তেল বিক্রি করলেও সেখানে প্রতিদিন লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। তাও আবার যানবাহন ভেদে সীমিত আকারে। এর মধ্যে নগরীর স্বনামধন্য পেট্রোল পাম্প কিউ সিতে হরদম এক কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের লাইন জমে থাকে।
নগরীর বায়েজিদ পেট্রোল পাম্প, মুরাদপুর ইন্ট্রাকো পেট্টোল পাম্পেও একই অবস্থা দেখা গেছে। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়েও জ্বালানি তেল মিলছে না। আর এই সময়ে রোদে পুড়ে খাঁক হচ্ছে যানবাহন চালকরা। কপালে জুটছে না খাবারও। অন্যদিকে যানবাহনের লাইনের জন্য নগরীর প্রতিটি সড়কে যানজটে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী।
তেলের জন্য এমন হাহাকার অবস্থার মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিপিসি বলছে, ডিপোগুলোতে এখন অকটেন ও পেট্রোল রাখার জায়গা নেই, রীতিমতো উপচে পড়ার মতো অবস্থা। এ কারণেই বিপিসি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অকটেন ও পেট্রোল নেওয়া বন্ধ করা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরবরাহ বন্ধ রাখতে দশ দিন আগে বিপিসি চিঠি দেওয়ায় মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তারা। এর মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা বলেন, গত ৮ এপ্রিল বিপিসি অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমাদের চিঠি দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে ১৬ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে গত ৫ এপ্রিলের বৈঠকে বিপিসির চাহিদা অনুযায়ী তারা প্রস্তুতি নিলেও এখন তেল নেওয়া হচ্ছে না। এখন তাদের ট্যাংকগুলো নাকি উপচে পড়ছে। ফলে দেশীয় এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, বিপিসির বিভ্রান্তিকর রেশনিং নীতির কারণেও জনমনে আতঙ্ক ও মজুতদারির প্রবণতা বেড়েছে। গত ৮ মার্চ থেকে সরকার তেলের রেশনিং শুরু করে। কিন্তু ঈদের আগে তা তুলে নিয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি তেল না দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশনার ফলেই পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে অকটেন মজুতের সক্ষমতা ৫৩ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। এর মধ্যে ১০ এপ্রিল ৩৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার পর বিপিসি আরো বিপাকে পড়েছে। কেরোসিনের ট্যাংকগুলো অকটেনের জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো সময়মতো প্রস্তুত করতে না পারাতেই এই বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে এক লাখ টনের বেশি মজুত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মাসে ডিজেল আমদানি ব্যাহত হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় চলতি মাসে চার লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। যার মধ্যে দুই লাখ টন ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি তেল আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই দেশে ঢুকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক ও জনসংযোগ দফতরের কর্মকর্তা মনিলাল দাশ বলেন, অকটেন ও পেট্রোল রাখার আর কোনো জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে অল্প অল্প করে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে তেল নেওয়া হচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল বিপিসিকে একটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।
তিনি আরো জানান, দেশে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টন পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা রয়েছে, যার ৭৫ ভাগই পূরণ করে দেশীয় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ চাহিদাই মেটায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। একই সঙ্গে ডিজেলের মজুত বাড়ায় ফিরেছে স্বস্তি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনায় পরিপক্বতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশে চাহিদার বড় একটি অংশের উৎপাদন হওয়ার পরও কেন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
তার মতে, সরকারের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনা উচিত।
প্রতিনিধি/এফএ




