চলতি অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আবারও নিম্নমুখী হয়েছে। ফেব্রুয়ারি শেষে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে, অর্থাৎ বিক্রির তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়েছে। এ সময়ে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই নিট বিক্রি কমেছে এক হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এর আগের মাস জানুয়ারিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়, তখন নিট বিক্রি কমেছিল এক হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। যদিও আগের কয়েক মাসে তুলনামূলক ভালো বিক্রির কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে নিট বিক্রি ছিল ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা এবং জানুয়ারি শেষে তা দাঁড়ায় ৬১০ কোটি টাকায়।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্র থেকে বিনিয়োগ সরে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাওয়া। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলেই প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ মিলছে, যা অনেক বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করছে।
এছাড়া বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতার দিক থেকেও পার্থক্য রয়েছে। সঞ্চয়পত্রে একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু ট্রেজারি বিল ও বন্ডে এমন কোনো সীমা নেই। একই সঙ্গে এসব সিকিউরিটিজ থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর করের বোঝাও তুলনামূলক কম বা নেই, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরও বাড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এক সময় সরকারের ঋণ চাহিদা কম থাকায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে সরকারের ঋণের প্রয়োজন বাড়ায় এসব সিকিউরিটিজে সুদের হার আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সঞ্চয়পত্র থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত অর্থবছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিট ঋণ ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মার্চ পর্যন্ত ইতোমধ্যে সরকার নিয়েছে প্রায় এক লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অপরদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্নস্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদহার ও বেশি সুবিধার কারণে বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র থেকে সরে গিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন, যা সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে।
টিএই/এমআই

