শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

এলপি গ্যাসের দামে বড় লাফ: রান্নার ব্যয় বেড়ে বিপাকে গ্রাহকরা

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

এলপিজির দামে বড় লাফ: রান্নার ব্যয় বেড়ে বিপাকে গ্রাহকরা

* এক লাফে দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশ 
* সরকারের দেওয়া দামের চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা বেশি বাজারে  
* দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক হয়নি: ক্যাব

দেশে আবারও বাড়তে শুরু করেছে মানুষের দৈনন্দিন খরচ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসের বাজারে। এলপি গ্যাসের (এলপিজি) দামে এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের হিসাব নতুন করে এলোমেলো হয়ে গেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য বাড়ার পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। ফলে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। সরকারিভাবেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

তবে বাস্তবে অনেক এলাকায় এই নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। কোথাও কোথাও প্রতিটি সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত খরচও নেওয়া হচ্ছে।  

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তারা বলছেন, আগে মাসে যেখানে এক থেকে দেড়টি সিলিন্ডার ব্যবহার করে তিন হাজার টাকার মধ্যে রান্নার খরচ সামলানো যেত, এখন একই পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতে সাড়ে তিন হাজার টাকার কাছাকাছি খরচ হয়ে যাচ্ছে। এতে মাসিক বাজেটে নতুন চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে স্থায়ী আয় না থাকা পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। 


বিজ্ঞাপন


শুধু রান্নার গ্যাস নয়, অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এপ্রিল মাসের জন্য প্রতি লিটার অটোগ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা আগের তুলনায় প্রায় ১৮ টাকা বেশি। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব দ্রুতই নিত্যপণ্যের বাজারে পড়বে।

এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন করে মূল্যচাপ দেখা যাচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, খোলা পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি ড্রামে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ছে। ফলে রান্নার সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। 

image
এলপি গ্যাস এখন শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধান জ্বালানি হয়ে উঠেছে

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ধাপে ধাপে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। রান্নার গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সেবাখাত পর্যন্ত সব জায়গায় খরচ বাড়তে থাকে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। 

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশের বাজারে প্রতিফলিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় সামনে আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, সেই দামে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। না হলে ঘোষিত মূল্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত অর্থ গুনতে বাধ্য হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এলপিজির বাজারে কার্যকর তদারকি জোরদার করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের দৈনন্দিন খরচের এই চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো, যাদের জন্য রান্নার গ্যাস এখন নিত্যদিনের অন্যতম বড় ব্যয়ের খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন, এক লাফে প্রায় ৪০০ টাকা এলপিজির দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। এত বেশি দামে এলপিজি কেনার সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই। একসময় লাকড়ি ব্যবহার করলেও এখন অনেকেই এলপিজিনির্ভর হয়ে পড়েছেন। ফলে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই দাম ধাপে ধাপে বাড়ানো হলে মানুষ সহজে মানিয়ে নিতে পারত। 

image
ছোট পরিবারেও ১২ কেজির এলপিজিতে মাসের রান্না শেষ হয় না। ফলে মাসে একাধিক বোতল গ্যাস কিনতে গিয়ে আর্থিকভাবে হিমশিম খেতে হয় অনেককে।

নাজের হোসাইন বলেন, শুধু দাম বাড়ানো নয়, সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। অতীতেও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হয়েছেন ভোক্তারা। ঘোষিত দামের পরও যদি বেশি দামে কিনতে হয়, তাহলে তা হবে ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’। এজন্য প্রশাসনিক নজরদারি জোরদারের দাবি জানান তিনি।

ক্যাব সহসভাপতি বলেন, এলপিজি এখন অনেক পরিবারের জন্য অপরিহার্য জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকলে মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী মাসগুলোতে দাম পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়বেই। তবে সমস্যা হচ্ছে, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি না থাকলে ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বাড়ে। তিনি বলেন, এলপিজি এখন শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধান জ্বালানি হয়ে উঠেছে। তাই এই খাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে। 

এমআর/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর