বাগেরহাটের মোংলায় যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের তেল স্থাপনায় (অয়েল ইনস্টলেশন) ডিজেলের বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে। ওই তেল স্থাপনার তিনটি ট্যাংকে ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল বেশি পাওয়া গেছে, যা কোম্পানির হিসাবের খাতায় ছিল না। বড় ধরনের জালিয়াতি, অনিয়ম ও পাচারের অংশ হিসেবেই অতিরিক্ত এই তেল ট্যাংকে রেখে হিসাবে কম দেখানো হয়েছে। গতকাল শনিবার দিবাগত গভীর রাতে আকস্মিক যৌথ অভিযানে জ্বালানি তেলের মজুতে ব্যাপক অনিয়ম ও গরমিলের বিষয়টি ধরা পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৮ মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ৩০ মিনিটে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের এই যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, তেল কোম্পানি ও পুলিশের ৯ জন একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন। ওই প্রতিবেদনে তেলের বড় ধরনের এই গরমিলের তথ্য উঠে আসে।
বিজ্ঞাপন
অভিযান চলাকালে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশনস) মো. আল আমিন খানের অনুপস্থিতিতে কম্পিউটার অপারেটর (অস্থায়ী) মো. ফারুক হোসাইন দাপ্তরিক রেজিস্ট্রার ও হিসাব উপস্থাপন করেন।
অভিযানকারী দল ওই ডিপোর তিনটি প্রধান ট্যাংক (ট্যাংক নং: ১, ৯ এবং ১৪) পরিমাপ করে। এতে দেখা যায়, ২৮ মার্চে পাঠানো অফিশিয়াল স্টেটমেন্টের সঙ্গে বাস্তব মজুতের মিল নেই। ১ নম্বর ট্যাংকে অফিশিয়াল হিসাব অনুযায়ী ডিজেল ছিল ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৮১৫ লিটার। অভিযানের সময় পরিমাপ করে দেখা যায়, সেখানে ডিজেল রয়েছে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৪৭ লিটার। সে হিসাবে ট্যাংকটিতে তেল বেশি ছিল ৯৩২ লিটার। ৯ নম্বর ট্যাংকে হিসাবের খাতায় তেল মজুত ছিল ২৪ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ লিটার; কিন্তু পরিমাপে এখানে ২৪ লাখ ২০ হাজার ৪৯৫ লিটার তেলের তথ্য উঠে আসে। সেই হিসাবে এই ট্যাংকে বাড়তি ডিজেল পাওয়া যায় ১২ হাজার ৮১৮ লিটার। ১৪ নম্বর ট্যাংকে অফিশিয়াল হিসাব অনুযায়ী ডিজেল মজুত ছিল ১২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫৫ লিটার। যৌথ অভিযানের সময় পরিমাপ করে এই ট্যাংকে ডিজেল পাওয়া যায় ১২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৯২ লিটার। যা অফিশিয়াল হিসাবের চেয়ে ১ হাজার ১৩৭ লিটার কম। সব মিলিয়ে মজুতের হিসাবের তুলনায় বাড়তি ডিজেল পাওয়া যায় ১২ হাজার ৬১৩ লিটার।
পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি ট্যাংকে উল্লিখিত পরিমাণ অতিরিক্ত তেল পাওয়ার ঘটনাকে অস্বাভাবিক বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ৯ নম্বর ট্যাংকে ১২ হাজার ৮১৮ লিটারের বিশাল ব্যবধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। তাদের আশঙ্কা, এই ট্যাংক থেকেই তেল পাচার করার উদ্দেশ্য ছিল পাচারকারী চক্রের।
আজ রোববার ওই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) অনুপ দাস, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশনস) প্রবীর হীরা, বাংলাদেশ নৌবাহিনী বানৌজা মোংলার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বিএন) রাইয়ান আলম, বাংলাদেশ নৌবাহিনী বানৌজা মোংলার এসএইচএ আবুল কাশেম, কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের লেফটেন্যান্ট বিএন খালিদ সাইফুল্লাহ, যমুনা অয়েল মোংলার গেজারম্যান মো. জাহিদুর রহমান, বানৌজা মোংলার চিফ পোর্ট অফিসার মো. মিজানুর রহমান, মোংলা থানার এসআই মো. ইমামুল ইসলাম ও যমুনা অয়েলের কম্পিউটার অপারেটর (অস্থায়ী) মো. ফারুক হোসাইন।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে জানতে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমির মাসুদকে ফোনকল করা হলে তিনি জানান, ওই ডিপোতে তেলের হিসাবে গরমিল পাওয়ায় ট্যাংকগুলো সিলগালা করা হয়েছে। আল আমিন খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে মো. আল আমিন খানের বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এফএ

