শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

হরমুজ প্রণালি সংকটে সমুদ্রপথে বাড়ছে ব্যয়, দ্বিগুণ দামে এলএনজি

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

হরমুজ প্রণালি সংকটে সমুদ্রপথে বাড়ছে ব্যয়, দ্বিগুণ দামে এলএনজি
হরমুজ প্রণালি সংকটে সমুদ্রপথে বাড়ছে ব্যয়, দ্বিগুণ দামে এলএনজি। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে কমে গেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি কনটেইনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করছে।

অন্যদিকে চলমান রমজান ও আসন্ন সেচ মৌসুম স্বাভাবিক রাখতে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে সরকার। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্য খাতে উদ্বেগ বাড়ছে।


বিজ্ঞাপন


শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে এ তথ্য জানান পেট্রোবাংলা ও শিপিং খাতসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নানা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ইনস্যুরেন্স কভারেজ, নাবিকদের নিরাপত্তা এবং জাহাজকে ঘুরপথে চালিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর বাড়তি ব্যয়—এসব কারণেই বড় শিপিং লাইনগুলো সারচার্জ আরোপ করছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর জন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের পণ্য পাঠানো হয়। গামছা, মুড়ি, বিস্কুট, সুপারি, সবজি, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য কনটেইনারে করে ওইসব দেশে যায়। কিছু পণ্য আকাশপথেও রপ্তানি করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিবহন ব্যবস্থাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আরব উপসাগরমুখী কিছু জাহাজ সমুদ্রে আটকে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এসব জাহাজকে নিকটবর্তী নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হতে পারে। এতে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হবে, যা পুষিয়ে নিতে শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন সারচার্জ আরোপ করছে।

শিপিং সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৪ টন ধারণক্ষমতার একটি সাধারণ কনটেইনারে নতুন করে ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। হিমায়িত পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত রেফার কনটেইনারে ১ হাজার ৬০০ ডলার থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশের কনটেইনার পরিবহন খাতে শীর্ষে থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক মার্স্ক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি), ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম এবং জার্মানির হাপাগ-লয়েড।

এর মধ্যে সিএমএ সিজিএম গত ৩ মার্চ ঘোষণা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩টি দেশে পণ্য পরিবহনে ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ আরোপ করেছে। এমএসসি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার বাধ্যতামূলক সারচার্জ নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে মার্স্ক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে এবং হাপাগ-লয়েড প্রতি কনটেইনারে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে।

এদিকে চলমান রমজান ও আসন্ন সেচ মৌসুম স্বাভাবিক রাখতে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে সরকার। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে গত বুধবার জরুরি ভিত্তিতে এই এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটের শঙ্কার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের নতুন বার্তা

স্বাভাবিক সময়ে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা খরচ হলেও বর্তমানে তা কিনতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লাগছে। ফলে সরকারকে বাড়তি প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে বলে জানান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক।

তিনি জানান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভোর গ্রুপের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৮.২৮ ডলারে একটি এবং ভিটলের কাছ থেকে ২৩.০৮ ডলারে আরেকটি এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে গানভোরের কার্গোটির দাম পড়বে প্রায় ১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা, যা গত জানুয়ারিতে ছিল মাত্র ৫০০ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার এক পরিচালক জানান, গানভোরের কার্গোটি ১৫ থেকে ১৬ মার্চ এবং ভিটলের কার্গোটি ১৮ থেকে ১৯ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মার্চ মাসের জন্য নির্ধারিত ৯টি কার্গোর মধ্যে চারটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করলেও দুটি জাহাজ এখনও আটকে আছে। শুরুতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো সাড়া না মেলায় সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই দুই কার্গো কেনা চূড়ান্ত করে পেট্রোবাংলা।

দেশে প্রতিদিন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি কার্গোতে প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস থাকে। একটি জাহাজ আটকে গেলে দেশে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দিনে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করবে। তবে গ্যাস রেশনিংয়ের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশের সার উৎপাদনে। গত বুধবার বিকেল ৩টা থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী সার কারখানার (কাফকো) উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে।

সিইউএফএল দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া এবং কাফকো ১ হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া ও ১ হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করে। এছাড়া ২ হাজার ৮৪০ টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানার উৎপাদনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এই তিনটি কারখানা বন্ধ থাকায় দৈনিক ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হলেও বোরো মৌসুমে বড় ধরনের সার সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এলপিজি বাজারেও। সরকারিভাবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

picture

বিশ্ববাজারে জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা জানিয়ে এলপিজি আমদানিকারকেরা জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। সরকার ফ্রেইট চার্জ টনপ্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২১ ডলার করলেও তা মানতে নারাজ ব্যবসায়ীরা।

তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান বাজারের এলপিজি আগের দামে আনা, তাই দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আগামী মাসে জাহাজ ভাড়া পর্যালোচনা করে নতুন দাম সমন্বয় করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি হওয়ায় দেশে কোনো সংকট নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়েই ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন হয়। লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকলেও অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত বিকল্প সমুদ্রপথ নেই।

আরও পড়ুন: হামলা বন্ধের জন্য যে শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

এমতাবস্থায় হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে অনেক শিপিং লাইন। ফলে নতুন চালান পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শিপিং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে জাহাজগুলোকে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ ও আমেরিকামুখী যাত্রা করতে হতে পারে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব, সময় এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। জাহাজে থাকা মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনারগুলোর ওপর ইতোমধ্যে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। যা শুধু শিপিং খাতে নয়, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ পণ্য বাল্ক কার্গো জাহাজে এলেও শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে রপ্তানির তালিকায় রয়েছে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজি, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা।

এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর