দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ তিন মাসে কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। কাগজ-কলমে এই হ্রাস স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খেলাপি ঋণের মোট অঙ্ক এখনো সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে, আর এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতায় ব্যাপক পুনঃতফসিলের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় শ্রেণীকৃত ঋণের বড় অংশ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে ঝুঁকির কাঠামো বদলায়নি। হিসাবের খাতায় খেলাপি ঋণের চাপ কমলেও ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ হাজার টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক কমলেও তা মূলত নীতিগত সহায়তার ফল।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতির আওতায় ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। বহু গ্রাহক শ্রেণীকৃত ঋণ নতুন করে সময়সীমা বাড়িয়ে নিয়মিত হিসাবের আওতায় এনেছেন। এতে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপিরা তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে গেছে। তবে এতে ঋণের গুণগত মান কতটা উন্নত হয়েছে, সে প্রশ্ন এখনো রয়েই গেছে। কারণ বর্তমানে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। কিন্তু সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। সে তুলনায় নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি এখনো ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং আমানতকারীদের জন্যও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ কমার পরও ব্যাংক খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফেরেনি।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
খেলাপি ঋণের সাম্প্রতিক ওঠানামার পেছনে রয়েছে আগের বছরগুলোর পুনর্মূল্যায়ন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন গোপন থাকা ঋণের প্রকৃত তথ্য সামনে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তী পুনর্মূল্যায়নে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ আড়াল করা হয়েছিল। ফলে প্রকৃত ঝুঁকি এক ধাক্কায় প্রকাশ পায়।
এরপর ২০২৫ সালের শুরু থেকে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চে তা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। জুনে বেড়ে হয় ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে আরও বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটিতে পৌঁছে রেকর্ড উচ্চতায় যায়। বিদেশি অডিট ফার্মের নিরীক্ষা এবং ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ফলে এ চিত্র স্পষ্ট হয়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ–এর রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, সাম্প্রতিক নীতিগত সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণ কাগজ-কলমে কমেছে। তবে এতে ব্যাংক খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি; বরং শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারও খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে।
টিএই/এমআই

