- রমজান এলেই কালোবাজারি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়
- বাজার নিয়ন্ত্রণে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা
- মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর বার্তা
- কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে ব্যবস্থা: বাণিজ্যমন্ত্রী
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রমজানকে ঘিরে বাড়তি চাহিদা এবং বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে এখনই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। গত বছরের বিভিন্ন সময়ে তা ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে অবস্থান করেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছুঁয়েছে ১২ শতাংশের বেশি। ফলে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, আলু, ডিম, সবজি—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।
বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যেন সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের নাম। বাজারে অস্থিরতা এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ে, তৈরি হয় কৃত্রিম সংকট। সিন্ডিকেট করে বাড়ানো হয় নিত্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাস ঘিরে এ প্রবণতা আরও তীব্র হয়। ফলে বিপাকে পড়েন সাধারণ ক্রেতারা।
এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কাজ শুরু করেছে। মন্ত্রিসভা সদস্যদের পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ইউএনওদেরও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা
বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন মাসকে অগ্রাধিকার দিয়ে রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট রোধ এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো সাউন্ড বাইট নয়, কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো হবে। তিনি জানান, রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের বাজার মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তথ্যভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ ও বাজার বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার অস্থিরতার পেছনে অন্যতম কারণ সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, কিছু আমদানিকারক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পণ্য খালাসের পর গুদামে মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। বিশেষ করে রমজানকে কেন্দ্র করে এই প্রবণতা বাড়ে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজির হোসাইন বলেন, অতীতে কয়েকটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফেরেনি।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষ ঠিকমতো খেতে না পারলে অসাধুদেরও রেহাই মিলবে না।
সম্প্রতি পুরান ঢাকায় এক অভিযানে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, করপোরেট মাফিয়ারা এখনও বহাল রয়েছে। তবে অতীতে যেভাবে বাজার সিন্ডিকেট করে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে, সেভাবে এবার আর জনগণের পকেট কাটতে দেওয়া হবে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রমজান এলেই কালোবাজারি ও অতিরিক্ত মজুত করে একটি পক্ষ নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তাই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সব সময় অভিযান চালাতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রমজানের ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে—গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে বাজারে ঘাটতির আশঙ্কা নেই। মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চাহিদা অনুযায়ী জোগান থাকলে মূল্যের ওপর নেতিবাচক চাপ পড়ার কথা নয়।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ট্রাকসেলের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ভর্তুকিমূল্যে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ
দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অনেকের আয় প্রায় পুরোটা খরচ হয়ে যাচ্ছে খাদ্য ক্রয়ে; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয়ের সুযোগ কমে গেছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকারের সক্ষমতার সূচক
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো বাস্তব প্রয়োগের গতি ও কার্যকারিতা। মাঠপর্যায়ের তদারকি, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং দামের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে পারলে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
সব মিলিয়ে রমজানের বাজার এখন নতুন সরকারের নীতিগত দৃঢ়তা, সমন্বয়ক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার বড় সূচক হয়ে উঠেছে। প্রথম তিন মাসে যদি নিত্যপণ্যের দামে দৃশ্যমান স্বস্তি আসে, তবে তা জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর বাজার মনিটরিং জোরদারে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে কঠোর তদারকির নির্দেশনা দেওয়া হলেও অতীত অভিজ্ঞতায় কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রমজান এলে খেজুর, ছোলা, লেবু, শসা ও বিদেশি ফলের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। পাইকারদের দাবি, আমদানিকারকেরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ান। রাজধানীর কাওরান বাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, আমদানিকারকেরা বন্দর থেকে পণ্য খালাসের পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সংকটের ধারণা তৈরি করেন। সুযোগ বুঝে তাঁরা দাম বাড়ালে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়েও তার প্রভাব পড়ে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো বাস্তব প্রয়োগের গতি ও কার্যকারিতা। মাঠপর্যায়ে তদারকি, সরবরাহ শৃঙ্খলার স্বচ্ছতা, আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা এবং দামের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি ও দামের চাপ জনঅসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রমজানের বাজার এখন সরকারের দক্ষতা, সমন্বয়ক্ষমতা ও নীতিগত দৃঢ়তার বড় সূচক হয়ে উঠেছে। প্রথম তিন মাসে যদি নিত্যপণ্যের দামে দৃশ্যমান স্বস্তি আসে এবং সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়, তবে তা জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বাজারদর নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকির আওতাধীন আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম সাময়িকভাবে বেড়েছিল। রমজানের শুরুতে একসঙ্গে বেশি কেনাকাটার প্রবণতা থাকে, বিক্রেতারাও সুযোগ নেন। পরে আবার দাম স্বাভাবিক হয়।
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এ বিষয়ে আগের অনেক সরকার আশ্বাস দিলেও কার্যকর ফল আসেনি। অপেক্ষা করুন, আমরা কাজ করে দেখাব।
অর্থনীতিবিদদের মতামত: শুধু অভিযান নয়, সমন্বিত নীতি দরকার
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু অভিযান নয়; উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, প্রশাসনিক তদারকির পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় প্রয়োজন। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বাড়ানো যেতে পারে। এতে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য ফিরবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা তৈরি হবে।
তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি মূল্য ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বন্দর ও পরিবহন ব্যয় যৌক্তিক রাখা এবং কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এমআর/এআর

