ঈদুল ফিতরের আগে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নির্বিঘ্ন করতে বকেয়া নগদ প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় এবং স্বল্পসুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চেয়েছে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। এ লক্ষ্যে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ছাড়ের পাশাপাশি দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার সফট লোন চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এনামুল হক খান বাবলু ও সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিত প্রস্তাব তুলে দেন।
বিজ্ঞাপন
সাক্ষাৎ শেষে শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার নগদ প্রণোদনা বকেয়া রয়েছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে যাতে কোনো কারখানা আর্থিক সংকটে না পড়ে, সে জন্য দ্রুত এ অর্থ ছাড়ের অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধাও চাওয়া হয়েছে।’
বিজিএমইএর হিসাবে, খাতটিতে এক মাসের মোট বেতন ব্যয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী দুই মাসে প্রয়োজনীয় অর্থ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ হাজার কোটি টাকা। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই অঙ্কটিই সফট লোন হিসেবে চাওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, সব কারখানা সমানভাবে প্রণোদনা পায় না। বিশেষ করে ওভেন ও সোয়েটার কারখানাগুলো তুলনামূলক কম প্রণোদনা পেয়ে থাকে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বেতন পরিশোধের চাপ বেশি পড়ে। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি ও মার্চ— এই দুই মাসে ৬০ দিনের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন সরকারি ছুটি ও নির্বাচনী কার্যক্রমে বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ৩৫ দিন কাজ করে ৬০ দিনের বেতন পরিশোধ অনেক কারখানার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
বিজ্ঞাপন
বৈঠকে গভর্নর প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান বিজিএমইএর সহসভাপতি। স্যালারি সাপোর্ট সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে উত্থাপনের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। বিজিএমইএর দাবি, গভর্নর কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি এবং প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
প্রণোদনা বিতরণে বর্তমান ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করেছে। বিজিএমইএ মনে করে, এসএমই কারখানাগুলোর জন্য আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেট বরাদ্দ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রে প্রথমে এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া উচিত। এরপর অবশিষ্ট অর্থ বড় কারখানাগুলোর মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে।
বিজিএমইএর দাবি, গভর্নর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী প্রণোদনা বিতরণ থেকে এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলেও তারা আশা করছেন।
সরকারি প্রণোদনার অর্থ যেহেতু সরকারই বরাদ্দ দেয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের প্রয়োজন কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ জানায়, তারা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে এবং অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছে। নীতিগত সমন্বয় এবং প্রক্রিয়াগত অগ্রগতির জন্য গভর্নরের সঙ্গেও বৈঠক করা হয়েছে, যা তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
প্রতিবছর ঈদের আগে কেন এ ধরনের ঋণ সহায়তার প্রয়োজন হয়— এ প্রশ্নে সংগঠনটির নেতারা বলেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ এবং নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রভাব শিল্প খাতে পড়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও প্রতিকূল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কনীতির প্রভাবেও রপ্তানি খাত চাপে রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতকে সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের সময়মতো বেতন–বোনাস নিশ্চিত করতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা নতুন কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং জমে থাকা প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় এবং যৌক্তিক ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি সহায়তা চেয়েছে। গভর্নরের সঙ্গে বৈঠককে ফলপ্রসূ উল্লেখ করে সংগঠনটি জানিয়েছে, প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
টিএই/এএম

