২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জনবান্ধব করার চ্যালেঞ্জ ছিল সরকারের সামনে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তাকে দেশের কর ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী মোড় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাঠামোগত সংস্কারে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আলাদা করার লক্ষ্যে জারি করা হয় ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’। নিকার (NICAR) সভায় এ বিষয়ে Rules of Business ও Allocation of Business সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পথ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে নীতি প্রণয়ন ও আদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব কমবে।
ছয় মাসে রেকর্ড রাজস্ব আদায়
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেশি।
কর ফাঁকি রোধ, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি এবং পূর্বে ফাঁকি দেওয়া কর পুনরুদ্ধারের কারণে এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
অবকাঠামো উন্নয়নে গতি
বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রামে আধুনিক কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস একাডেমি নির্মাণের আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে চট্টগ্রাম কর ভবনের ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে খুলনা কর ভবনের নির্মাণ শেষ হয়েছে, যার উদ্বোধন হচ্ছে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬।
কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে সরে আসা
Tax Expenditure Policy and Management Framework (TEPMF) গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে কর অব্যাহতির বিষয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট আইনে সংশোধন এনে এনবিআরের এককভাবে কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে কর নীতিতে শৃঙ্খলা আসবে এবং রাজস্ব ক্ষতি কমবে।
ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় বড় অগ্রগতি
ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক, অনলাইন কর পরিশোধ, মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর জমা, A-Challan ও ASYCUDA World–iBAS++ ইন্টিগ্রেশন—সব মিলিয়ে কর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুত এগিয়েছে। বর্তমানে ৩৪ লাখের বেশি ই-রিটার্ন জমা পড়েছে। প্রবাসীদের জন্য ই-মেইলে OTP পাঠিয়ে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু হওয়ায় বিদেশে অবস্থানরত করদাতাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এক মাসেই ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন নিবন্ধন
ভ্যাট দিবস ২০২৫ উপলক্ষে বিশেষ ক্যাম্পেইনে ডিসেম্বর মাসেই ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে যেখানে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছিল ৫ লাখ ১৬ হাজার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজারে।
হজ, মেট্রোরেল ও নিত্যপণ্যে স্বস্তি
হজ যাত্রীদের বিমান টিকিটে আবগারি শুল্ক অব্যাহতি, মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট ছাড়, রমজানে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর হ্রাস এবং চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপণ্যে কর অব্যাহতির মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
কাস্টমস আধুনিকায়নে নতুন দিগন্ত
Bangladesh Single Window (BSW) চালুর ফলে ১৯টি সংস্থার লাইসেন্স ও সনদ এখন অনলাইনে মিলছে। এক ঘণ্টার মধ্যেই ৮৪ শতাংশ আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে। ASYCUDA World–এ নতুন ট্রাক মুভমেন্ট সাব-মডিউল ও FxTMS সংযোগ কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করা এবং কর অব্যাহতি সংস্কার বাংলাদেশের রাজস্ব ইতিহাসে বড় মাইলফলক। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সহায়ক হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, ডিজিটালাইজেশন ও অনলাইন রিফান্ড চালু হওয়ায় করদাতার আস্থা বাড়ছে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এত কাঠামোগত সংস্কার বিরল। বাস্তবায়ন ধারাবাহিক হলে এটি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
স্বল্প মেয়াদের অন্তর্বর্তী সরকার হলেও রাজস্ব খাতে নীতি সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তা দেশের কর ব্যবস্থাপনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এমআর/এআর

