ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতিকে নির্বাচিত সরকারের জন্য ‘সন্তোষজনক ও স্থিতিশীল’ অবস্থায় রেখে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা অর্থনীতিকে একটি সন্তোষজনক অবস্থায় রেখে যাচ্ছি। পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হবে না। পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল, আগের মতো নড়বড়ে নয়। তবে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি আর আগের মতো ভঙ্গুর বা অস্থিতিশীল অবস্থায় নেই। ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থিতিশীল করা হয়েছে।’
সরকার রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছে কি না— এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘ঋণগ্রহণ বেড়েছে ঠিকই। তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক ঋণও পরিশোধ করা হয়েছে। এটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
অনেক বড় ও ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প এড়ানো হয়েছে বলেও জানান অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমরা টানেল বা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণনির্ভর ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্পে যাইনি। এ কারণেই সরকারি ঋণের চাপ আরও বাড়েনি।’
বিজ্ঞাপন
তিনি স্বীকার করেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন।’
উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এর জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ অপরিহার্য। কিন্তু, আমাদের যথেষ্ট আর্থিক সুযোগ ছিল না। বড় কারখানাগুলো শ্রমনির্ভর নয় এবং এগুলোতে অনেক জটিলতা থাকে।’
অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে উদ্বেগ দূর করতে গিয়ে ড. সালেহউদ্দিন স্পষ্ট করেন, ‘অর্থনীতি স্থিতিশীল হলেও সংস্কারগুলোকে সুসংহত করে সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সংস্কারের জন্য সময়, সহযোগিতা এবং প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনেকটা কঠিন। সংস্কার শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়। এর জন্য প্রক্রিয়া, সহযোগিতা এবং ধৈর্য প্রয়োজন। সিস্টেমের ভেতরে প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত জটিল। সহযোগিতা ছাড়া এটি খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।’
সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকার ভূমি রেকর্ড ও খতিয়ান মানচিত্র ডিজিটালাইজেশনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা এই সেবাকে সাশ্রয়ী ও নাগরিকদের জন্য আরো সহজলভ্য করেছে।’
তিনি বলেন, ‘পর্চা ও ভূমি রেকর্ড ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। এখন মানুষ ২০ টাকায় সেবা পাচ্ছে, যা আগে ৫০০ টাকা খরচ হতো। আমরা সারা দেশে ডিজিটাল প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করছি।’
তিনি এ উদ্যোগকে অন্যতম মৌলিক সেবা প্রদানের সংস্কার হিসেবে বর্ণনা করেন, যা হয়রানি কমাবে এবং স্বচ্ছতা বাড়াবে।।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘সরকার এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে আর্থিক বিরোধ ও অর্থপাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সালিশ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট পক্ষ অভিযোগ দায়ের করার পর বিশ্বব্যাংক-সংযুক্ত সালিশি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড)-এ একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা বিশ্বব্যাংকের ফোরামে সালিশে গেছে। আমরা নোটিস পেয়েছি এবং এর জবাব দিতে হবে। এটি বিপুল অর্থের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়।’
অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকার মামলাটি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করব। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। আইনি প্রস্তুতি অপরিহার্য। একটি সরকারি দল সালিশি প্রক্রিয়া মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ডিসি সফর করবে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘বিদ্যুতের শুল্ক ইচ্ছামতো বাড়ানো হচ্ছে না, বরং যৌক্তিকীকরণ করা হচ্ছে। এটি শুল্ক পুনর্গঠন, মূল্যবৃদ্ধি নয়। অর্থ এক অংশ থেকে অন্য অংশে সমন্বয় করা হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ সরবরাহকে প্রভাবিত করবে না।’
তিনি বলেন, ‘আশুগঞ্জসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বিষয়ক সমস্যাগুলোও পর্যালোচনায় রয়েছে। সমালোচনা সত্ত্বেও অনেক মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তবে সেগুলো সবসময় দৃশ্যমান নয়।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মানুষ বলে কিছুই করা হয়নি। কারণ, তারা শুধু দৃশ্যমান প্রকল্প খোঁজে। কিন্তু অনেক মৌলিক প্রক্রিয়াগত সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। কেউ যদি দেখতে না চায়, তাহলে তো তারা দেখবে না।’
এএইচ

