আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করতে ১২ দফা নাগরিক ইশতেহার উন্মোচন করেছেন।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট— বিডব্লিউজিইডি। সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নেয় বেলা, বিলস্, ক্লিন, ইটিআই বাংলাদেশ, লিড, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং রিগ্লোবাল।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। তারা আশা করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যেন নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই ১২ দফা দাবি অন্তর্ভুক্ত করে।
ইশতেহার পাঠ করেন ক্লিন-এর নেটওয়ার্ক অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা।
তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে ৯৯.২৫ শতাংশ পরিবারে। কিন্তু ফসিল জ্বালানি নির্ভরতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং অবাস্তব পরিকল্পনার কারণে আর্থিক ক্ষতি, পরিবেশগত অবনতি ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে কার্বন নিঃসরণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের বায়ুর মান বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বিডব্লিউজিইডি-এর সদস্যসচিব হাসান মেহেদী বলেন, গত ১৬ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ১.৭২ ট্রিলিয়ন টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে, আর পিডিবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২.৫৩ ট্রিলিয়ন টাকা। যার কারণে সরকারকে ২.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি মন্তব্য করেন, ‘সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ মূলত ফসিল জ্বালানি ঘিরে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতেই চলে গেছে।’
প্যানেলে আরও উপস্থিত ছিলেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক ওয়াসিউর রহমান এবং লিড বাংলাদেশের গবেষণা পরিচালক শিমনউজ্জামান। তারা বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখনই ন্যায়সঙ্গত ও জনগণ-কেন্দ্রিক শক্তি রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময়।
১২ দফা নাগরিক ইশতেহার
১. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং নীতিমালা তৈরির আগে নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণ।
২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি রোধে সকল চুক্তি উন্মুক্তকরণ এবং অসাধুদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
৩. জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি ধীরে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শিল্প ও আবাসিক খাতে বাধ্যতামূলক রূপান্তর।
৪. নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়া ও অকার্যকর কেন্দ্র বন্ধ করে নবায়নযোগ্য বিকল্প স্থাপন।
৫. নতুন এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, সার কারখানায় গ্যাস বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং গ্যাসের অপচয় রোধে সর্বক্ষেত্রে মিটার প্রবর্তন।
৬. ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ, ২০৪১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৭. পরিবহন খাতে সবুজায়ন: বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) শুল্ক ৭৫ শতাংশ কমানো এবং উন্নত ব্যাটারি আমদানি কর শূন্যে নামানো।
৮. জাতীয় গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর এবং সূর্যবাড়ি কর্মসূচিতে ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ বৃদ্ধি।
৯. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ ও সহজ ব্যাংক ঋণ।
১০. অ্যামোনিয়া, সিসিএস, হাইড্রোজেন, পারমাণবিক ও বর্জ্য-বিদ্যুৎসহ অপ্রমাণিত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি পরিহার এবং সার্কুলার সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়ন।
১১. সব নীতিতে নারী, আদিবাসী, কৃষক, জেলে ও দরিদ্র জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের মুনাফায় স্থানীয়দের হিস্যা দেওয়া।
১২. কৃষি জমি রক্ষায় জ্বালানি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদী ইজারা চালু এবং কৃষিবিদ্যুৎ–ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া।
এমআর/এএইচ

