মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ছাপানো টাকা কীভাবে বাজারে আসে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৫, ০৪:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

ছাপানো টাকা কীভাবে বাজারে আসে
খোলা বাজারে বিক্রি হয় নতুন টাকা। ছবি: ঢাকা মেইল

চাইলেই ইচ্ছেমতো টাকা ছাপাতে পারে না সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে কোটি কোটি টাকা মজুত থাকলেও তা বাজারে ছাড়তে হয় অনেক হিসাব-নিকাশ করে। দেশের অর্থনীতির আকার ও চাহিদা বিবেচনায় কী পরিমাণ নগদ নোট দরকার অর্থাৎ জিডিপির সাথে সমন্বয় করে সে আলোকে বাজারে টাকা ছাড়া হয়। আর একটি অংশ সব সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকের ভল্টে মজুত রাখা হয়। বাজারে টাকার চাহিদা বাড়লে তখন মজুত কমে। চাহিদা কমলে মজুত বাড়ে।

টাকা মুদ্রণ বা ছাপা হয় গাজীপুরে অবস্থিত টাঁকশালে। দেশের মানুষের কাছে এটি ‘টাঁকশাল’ নামে পরিচিত হলেও টাকা ছাপানোর এই প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড।’ গ্রাহকদের হাতে থাকা সব টাকাই নগদ আকারে থাকে না। মোট টাকার সামান্য অংশই নগদে ছাপানো থাকে। বাকি টাকা অ্যাকাউন্ট স্থানান্তরভিত্তিক। পুরো টাকা কখনো একবারে প্রয়োজন হয় না।

মুদ্রার প্রচলন শুরুর আগে সভ্যতা বিকাশের শুরুর দিকে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য লেনদেন হতো। এরপর শুরু হলো স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন। সেখান থেকে এলো কাগুজে মুদ্রা। একটি সময় নোট ইস্যু হতো ওই দেশের মজুত স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিপরীতে। পরবর্তী সময়ে এ দুটির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা এবং সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে মুদ্রা ছাপানো শুরু হয়। সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে মুদ্রা বেশি ছাপলে স্বাভাবিকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ে। যে কারণে অনেক হিসাব করে এ ধরনের নোট ইস্যু হয়। অবশ্য নোট ইস্যু করা আর নোট ছাপিয়ে বাজারে দেওয়া এক বিষয় না।

আরও পড়ুন

ব্যাংকে হাহাকার, ফুটপাতে এত নতুন নোট এলো কীভাবে?

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশে কিছুদিন পাকিস্তানি টাকার প্রচলন ছিল। তখন ওই টাকার নোটে ‘বাংলাদেশ’- লেখা স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হতো। পাকিস্তানি মুদ্রার পরিবর্তে বাংলাদেশের মুদ্রা হিসেবে টাকার প্রচলন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ। বাংলাদেশে কাগজে তৈরি মুদ্রার নাম টাকা। দেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে বাড়ছে মুদ্রা প্রবাহ। এই প্রবাহিত মুদ্রার বেশির ভাগই রয়েছে মানুষের হাতে হাতে।

Taka1

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্নিষ্টরা জানান, চাইলেই টাকা ছাপানো যায় না। যেমন- কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামীকাল সিদ্ধান্ত নিলো টাকা ছাপানো হবে। তাহলে প্রথমে কাগজ ও কালি কেনার টেন্ডার আহ্বান করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এজন্য অন্তত চার মাস সময় লাগে। আর কাগজ কেনার আদেশ দেওয়ার পর দেশে আসতে লাগে আরও পাঁচ মাস। আবার টাকা মূল্যমানের আলোকে প্রতিটি কাগজ থাকে আলাদা, যেখানে মূল্যমানের জলছাপ থাকে। ফলে প্রতিটি মূল্যমানের ভিত্তিতে কাগজ আনতে হয়। কাগজ-কালি ছাপাখানা পর্যন্ত পৌঁছানোর পর ১০, ২০ ও ৫০, ১০০ টাকার নোট ছাপা শুরুর দিন থেকে বাজারে দিতে অন্তত ১৭ দিন লাগে। আর ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট ছাপা শুরুর দিন থেকে বাজারে যাওয়া পর্যন্ত লাগে অন্তত ২৬ দিন। কেননা নোট ছাপানোর পর প্রথমে তা বদ্ধ ঘরে বিশেষ ব্যবস্থায় শুকানো হয়। শুকাতে তিন থেকে সাত দিন সময় লাগে। শুকানোর পর প্রতিটি নোটের ছাপার মান যাচাই করা হয়। মান ঠিক থাকলে তা কাটিং করে বাইন্ডিং করা হয়। এরপর আবার মান যাচাই করে বাক্সবন্দি করে নানা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাজারে দেওয়া হয়।

সাধারণত, দেশের প্রত্যেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট শাখা (মেইন ব্রাঞ্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা নিতে পারে। আর এভাবেই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে মানুষের হাতে নতুন টাকা আসে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়াও কখনো কখনো (দুই ঈদে) কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সাধারণ মানুষের হাতে নতুন টাকা তুলে দেয়।

আরও পড়ুন

এবার প্রকাশ হলো সব নোটের নতুন নকশা

টাকাও এক ধরনের কাগজ। তবে এটি মূল্যবান হয়ে উঠেছে বিনিময় মূল্যের নিশ্চয়তার কারণে। বর্তমানে মোট লেনদেনের বড় অংশ হয় অনলাইনভিত্তিক। বাংলাদেশ ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের জন্য কিউআর কোডভিত্তিক আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা চালু করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের ১২শ’ দোকানে এ রকম লেনদেন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ক্যাশলেস হলে নগদ লেনদেন আরও কমবে। পুরো ক্যাশলেস হলে তখন আর ছাপানো নগদ টাকার প্রয়োজনই হবে না।

Taka3

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই মানুষের হাতে নগদ বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ কমতে থাকে। অর্থাৎ মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বাড়তে থাকে। গত বছরের আগস্টে মানুষের হাতে বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ, পরের মাস অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস নভেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস ডিসেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি ৫ লাখ, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ এবং ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

২০ টাকার নতুন নোট বাতিল চায় হেফাজত

তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক কমছিল ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। কিন্তু নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করে। যেটা গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে সেটা বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬০ কোটি, জানুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৯৫ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ কোটি, মার্চে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৯৫ কোটি, এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, মে মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, জুনে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩৬ কোটি, জুলাইয়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি ও আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দশ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছে ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

টিএই/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর