পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ, কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা

জেলা প্রতিনিধি
মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর ২০২২, ০৯:১৩ এএম
পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ, কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা
ছবি : ঢাকা মেইল

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গজারিয়া চকের ৫ হাজার বিঘা জমিতে পানি জমে আছে। কয়েক বছর ধরে কৃষক এই চকে শুধু বোরো ধান রোপন করে আসছে। এক সময় এই চক শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ, খালের ওপর মাটির বাঁধ দেওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ রয়েছে। এতে উপজেলার ১১টি গ্রামের দেড় হাজার কৃষক পরিবার এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, চকে সরিষা চাষের উপযোগী করার জন্য পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তারা।  

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছেন, জলাবদ্ধতা না থাকলে এ চকের ৮ কোটি টাকার সরিষা আবাদ করা সম্ভব। 

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন উপজেলার পৌরসভা ও দিঘী ইউনিয়নের মধ্যে এই চকটির তিন দিকে রয়েছে পৌলি, চামটা, সেওতা, বান্দুটিয়া, খাগড়াখড়ি, ভাটবাউর গ্রাম। উত্তর দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। 

মহাসড়কের তিনটি কালভার্টের নিচ দিয়ে পাশের খাল থেকে বর্ষার পানি চকে ঢোকে। আবার বর্ষা মৌসুম শেষে ওই খাল দিয়েই পানি বেরিয়ে যায়। এছাড়া সেওতা এলাকার আবেদ মিয়ার বাড়ি থেকে মাখু বাবুচির ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার খাল ভরাট করা হয়েছে। সেখানে পাইপ বসিয়ে ড্রেন তৈরি করা হয়েছে। ড্রেনটি প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণের ফলে পানি নামতে পারছে না। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন খালটিও বেশ কিছু স্থানে ভরাট করা হয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা আরও বড় আকারে দেখা দিয়েছে।

কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, একসময় গজারিয়া চক ছিল বিশাল একটি বিল। প্রায় সারাবছর পানি থাকতো। কালক্রমে বিলটি ভরাট হয়ে গত প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে তিন ফসলি জমিতে পরিণত হয়। পর্যায়ক্রমে সরিষা, বোরো ও আমন ধানের আবাদ হয়ে আসছিল। কিন্তু চকে পানি ঢোকার খালের ওপর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভরা বর্ষায় ঢুকতে পারলেও মৌসুম শেষে পানি আর বের হতে পারে না। পুরো চকই প্রায় চার-পাঁচ ফুট পানিতে ডুবে থাকে।

কৃষক মো. হাসেম আলী বলেন, গজারিয়া চকে আমার ২ বিঘা জমি আছে। পাঁচ বছর আগেও তিন ফসলি জমি ছিল। এবার সরিষা চাষের মৌসুমেও জমি থেকে পানি নামেনি। জমির যে অবস্থা তাতে এবার আর সরিষা চাষ করতে পারব না। 

তিনি বলেন এভাবে থাকলে বোরো আবাদও করা সম্ভব হবে না।

কৃষক আলী আহামেদ বলেন, এই জমির ওপরেই পুরো পরিবার নির্ভরশীল। গত কয়েক বছর ধরে কেবল বোরো ধান চাষ করতে পারছি। অন্যায়ভাবে বাঁধ দিয়ে আমাদের সর্বনাশ করা হচ্ছে। 

প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধি কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দিঘী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আখতার উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে কৃষকেরা কয়েকবার মানববন্ধনসহ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আকারে স্মারকলিপি দিয়েছেন। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, কালভার্ট, বাঁধের ফলে গজারিয়া চকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি। 

জলাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা কৃষি সম্প্রাসারন অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, জলবায়ু ট্রাস্টের অর্থায়নে যে ড্রেনটি করা হয়েছে, তা সঠিকভাবে হয়নি। যে কারণ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। 

তিনি জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা পাম্পের মাধ্যমে পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিয়ে এ বছর চকে সরিষা আবাদের চেষ্টা করছি। আবাদ করতে পারলে ৮ কোটি টাকার সরিষা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। 

তিনি আরও বলেন, বোরো আবাদ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। আমরা আশা করছি এই চকের জমি থেকে এ বছর আট হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করব। 

জেলা প্রশাসক মোহম্মদ আব্দুল লতিফ বলেন, গজারির চকে জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। চকে জলাবদ্ধতা যাতে সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যাবে। 

প্রতিনিধি/এইচই