বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ভয়াল ১২ নভেম্বর: দুঃসহ স্মৃতি উপকূলবাসীদের কাঁদায় আজও

জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২ নভেম্বর ২০২২, ১২:০১ এএম

শেয়ার করুন:

ভয়াল ১২ নভেম্বর: দুঃসহ স্মৃতি উপকূলবাসীদের কাঁদায় আজও
ছবি : সংগৃহীত

ভয়াল ১২ নভেম্বর আজ। ১৯৭০ সালের এই দিনে ভয়াল গোর্কির আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নোয়াখালীসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। উপকূলীয় অঞ্চলের হাতিয়া, সুবর্নচর (তৎকালীন চরবাটা), সদর, কোম্পানীগঞ্জে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলে। প্রকৃতির নারকীয় তাণ্ডবে পরিণত হয় বিরান ভূমিতে। ২০ ফুটেরও অধিক পানিতে তলিয়ে যায় গোটা জনপদ। উপকূলে প্রাণ হারায় লক্ষাধিক মানুষ। দুর্বিষহ সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি নোয়াখালীর মানুষ। 

স্বজন হারানো সেই বিভীষিকাময় দিনটি মনে পড়তেই আঁতকে উঠছেন কেউ কেউ। প্রতি বছর দিনটি স্মরণে আলোচনা সভা, সেমিনার, কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। 


বিজ্ঞাপন


জানা যায়, উপমহাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। শুধু নোয়াখালীতেই অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর অসংখ্য জনপদ বিরাণ প্রান্তরে রূপ নেয়। উত্তাল মেঘনা নদী আর তার শাখা-প্রশাখাগুলো রূপান্তরিত হয়েছিল লাশের মিছিলে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। ঝড়ের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চল। নদীতে এতো লাশ ছিল যে, তৎকালীন মহকুমা প্রশাসন সাময়িক সময়ের জন্য মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। 

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ, উপকূলের জন্য ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দিনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতি আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকায় তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৭০ এর ভয়াল ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টিকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ‘প্রাণঘাতি ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে উল্লেখ করা করেছে।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর (বুধবার) সকাল থেকেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হতে থাকে। পরদিন ১২ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে লাগল। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যার পর থেকেই ফুঁসে উঠতে শুরু করে সমুদ্র। তীব্র বেগে লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসে পর্বতসম উঁচু ঢেউ। সেই ঢেউ আঁচড়ে পড়ে লোকালয়ের ওপর। আর মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষ, গবাদিপশু, বাড়ি-ঘর, ক্ষেতের সোনালী ফসলসহ অনেক কিছু। পথে প্রান্তরে খোলা আকাশের নীচে পড়েছিল কেবল লাশ আর লাশ। মৃত্যুপুরীতে রূপ নেয় নোয়াখালীসহ গোটা অঞ্চল।

প্রবীণ সাংবাদিক ও নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি বখতিয়ার শিকদারের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেইলের এ প্রতিবেদকের সাথে। সেদিনের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তখনকার সময়ের প্রযুক্তি এখনকার মতো এত উন্নত ছিল না। আবহাওয়া রিপোর্ট ও এত আপডেট ছিল না। তবে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ও বাতাস দেখে বিকেল থেকেই আমরা আন্দাজ করতে পেরেছি যে রাতে বড় তুফান হবে। সেদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঘরে চলে আসি। রাত যত গভীর হয় ততই ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে। রাতে তীব্র বাতাসের সঙ্গে ঘর নড়াচড়া শুরু করে৷ আমার বাবা আমাকে উচ্চস্বরে আজান দিতে বলে। আমি ভয়ে ভয়ে উচ্চস্বরে আজান দেই। সারারাত কারও চোখে ঘুম নেই। পরদিন সকালে বের হয়ে দেখি বাড়ির সামনের উঁচু গাছপালা সব ভেঙে একাকার।  শহরে চলে যাই খোঁজ-খবর নিতে। তারপর একমাস বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ত্রাণ বিতরণ করি। সুবর্নচর, হাতিয়ার বিভিন্ন এলাকাই ত্রাণ নিয়ে যাই। এক সঙ্গে মানুষ, গরু, মহিষের এত মরদেহ আমি আর কখনও দেখিনি। সে ভয়াল স্মৃতি এখনও চোখে ভেসে উঠে। এখনও কোনো ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস শুনলে আঁতকে উঠি। মনে ভয় হয়।


বিজ্ঞাপন


এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সেদিনের ভয়াল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ উল্লাহর (৬৯) । কবিরহাট উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের চর গুল্যাখালি গ্রামের সৈয়দ উল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন,  তখন আমার বয়স ১৭ বছর ছিল। সরারাত ভয়ে কেঁদেছি। মানুষের আহাজারি নিজ চোখে দেখেছি। বিদ্যুৎ বা টর্চলাইট ছিলো না। হারিকেন আর কুপি বাতি নিয়ে মানুষজন দ্বিকবিদিক হয়ে ছোটাছুটি করেছে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। পরদিন চারদিকে স্বজন হারানোদের কান্নায় আকাশ ভারি হয়ে উঠে। পরিবার-পরিজন, গবাদিপশু ও ক্ষেতের ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় অনেকে। ভয়াল গোর্কির আঘাতের ১০-১২ দিন পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে হেলিকপ্টার যোগে ত্রাণ পাঠানো হয়।

চাপরাশিরহাটের বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সী আবদুল আলীম চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, সে ভয়ংকর রাতের কথা এখনও ভুলিনি। বেড়িবাঁধের পাশে লাশ আর লাশ। মানুষের সাথে পশু পাখির লাশ। স্নেহময়ী মা জড়িয়ে আছে শিশুর লাশ। বাগানে গাছের ডালে ঝুলছে মানুষের লাশ। সে রাতে আমার ও ২ জন আত্মীয় মারা যায়। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে আমাদের মনে।

কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে হু হু করে কেঁদে দেন আবদুল আলীম চৌধুরী। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমরা উপকূলের মানুষ এখনও নিরাপদ না। এখনও সামান্য বাতাস হলে ভয়ে ঘুমাতে পারি না। এখনও ঝড় এলে কানে বাজে সেদিনের ঝড়ের শব্দ। চোখে ভেসে উঠে মানুষের আহাজারি। 

ক্ষতিগ্রস্ত সেই জনপদে নতুন করে জনবসতি গড়ে ওঠা চরগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় এখনও মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে চরে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষ। ১৯৭০ এর ১২ নভেম্বরের ভয়াল ‘গোর্কি’তে নোয়াখালী উপকূলের অর্ধ লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানির পর উপকূল জুড়ে ব্যাপক বনায়নের ফলে সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক দেয়াল তৈরি হয়। তৈরি হয় বেড়িবাঁধ ও আশ্রয়ন কেন্দ্রের।

প্রতিনিধি/এইচই

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর