আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করছেন শেরপুরের বদরুল মোর্শেদ 

জেলা প্রতিনিধি
শেরপুর
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২২, ১১:২৫ এএম
আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করছেন শেরপুরের বদরুল মোর্শেদ 
ছবি : ঢাকা মেইল

চলতি বছরের ১৬ আগস্ট শেরপুর সদরের চরশেরপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর এলাকায় মীম আক্তার (১৯) নিজ ঘরের আড়ার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে থানা পুলিশ গিয়ে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। একইদিন ঝিনাইগাতীর শালচূড়া এলাকার মায়া আক্তার মৌ (১৪) সন্ধ্যার দিকে নিজ পড়ার কক্ষে গলায় উড়না পেঁচিয়ে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করে। পরে থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। ওইদিনই সকালে নকলা উপজেলার দক্ষিণ লয়খা এলাকার অজুফা বেগম (৩০) নিজের ঘরের শয়নকক্ষের বাঁশের আড়ার সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে। 

তুলনামূলক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা, করোনাকালে বেড়েছে বহুগুণ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে নেই জোরালো কোনো পদক্ষেপও। চ্যালেঞ্জ জেনেও আত্মহত্যা প্রবণতারোধে কাজ করে যাচ্ছেন ‘সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ’ এর সহ প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বদরুল মোর্শেদ আসাদ।

আসাদ জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার মালিঝিকান্দা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে বর্তমানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করছে। আসাদ মালিঝিকান্দা গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে। 

‘পারষ্পরিক সহমর্মিতা রুখতে পারে আত্মহত্যা’—এ স্লোগান নিয়ে ২০১৮ সালে স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্নে যারা ছিল তারা কেউ আর এখন এই সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত নেই। নিজেদের ক্যারিয়ার ও সংগঠনের কাজকে চ্যালেঞ্জিং মনে করে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে আশাহত হননি এই তরুণ।

বদরুল মোর্শেদ আসাদ জানান, অনলাইনে কারও হতাশাজনক স্ট্যাটাস দেখলে ও মেনশন পেলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের সদস্যরা ওই ব্যাক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে দেখা করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেই আমরা। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির কথা মনোযোগ সহকারে শুনে সমাধান বের করার চেষ্টা করি।

তিনি আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ আত্মহত্যাপ্রবণ স্ট্যাটাস দিলে আমরা তাৎক্ষণিক তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। তাকে ফোন কল বা ও ভিডিও কলের মাধ্যমে কাউন্সিলিং করা হয়। প্রয়োজনের তার সঙ্গে দেখা করে কাউন্সিলিং করি আমরা। তার কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

ফেসবুক পাবলিক গ্রুপ, ফেসবুক আইডি ও পেজের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার করে এই সংগঠনের সদস্যরা। এমনকি ক্যারিয়ার গঠন, প্যারেন্টিং, পারিবারিক শিক্ষা ও সন্তান পালনে করণীয় শীর্ষক ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা দেয় এই সংগঠন।

তিনি বলেন, সংগঠনটি প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন ফয়সাল আহমেদ, পরিচালক (সার্বিক) দায়িত্বে আছেন সিদ্দিকুন সিমলা, ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক রাব্বানী আহমেদ, বাগেরহাট জেলা সমন্বয়ক আবিদা খান, ময়মনসিংহ এর মনির হাসান শিমুল, ঢাকার সাভার থেকে নাঈম হোসেন, নোয়াখালী থেকে নজরুল ইসলামসহ নরসিংদী থেকে মাসুমা হক, রাজধানীতে আরও কাজ করছেন মৌ, কুড়িগ্রামে মায়া সুলতানা, শেরপুরে শিমুল আকন্দ ও পূজা পাল, খাগড়াছড়িতে নাঈমুল ইসলাম ভূইয়া কাজ করছেন। 

ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক রাব্বানী আহমেদ জানান, ফেসবুক পাবলিক গ্রুপ, ফেসবুক আইডি ও পেজের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার, নিয়মিত লাইভ প্রোগ্রাম, কাউন্সিলিং সেশন করে এই সংগঠনের সদস্যরা। এমনকি ক্যারিয়ার গঠন, প্যারেন্টিং, পারিবারিক শিক্ষা ও সন্তান পালনে করণীয় শীর্ষক ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা দেয় এই সংগঠনটি। 

সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে সিদ্দিকুন সিমলা ঢাকা মেইলকে বলেন, সারা দেশে স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী আছে যারা অফলাইন ও অনলাইনের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন।

সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক ফয়সাল আহমেদ আমাদেরকে জানান, আমরা অনলাইনের মাধ্যমে অন্তত ৫০০০ জনকে সেবা প্রদান করেছি। আত্মহত্যার চিন্তা করেছে এমন ২৭০ জনকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী মাসুমা হক ঢাকা মেইল কে জানান দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সভা, সেমিনার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরিকল্পনা আছে আমাদের।  

সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বদরুল মোর্শেদ বলেন, সারা দেশের প্রতিটি প্রান্তে সচেতনতা তৈরি করতে চাই, সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে। ভবিষ্যতে একটা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার করার ইচ্ছা আছে। এমন একটা প্ল্যাটফর্ম করতে চাই যেখানে মানুষ যোগাযোগ করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও প্যারেন্টিং, ক্যারিয়ার ও জীবন ভিত্তিক পরামর্শ পাবেন। হতাশাগ্রস্ত ও আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের কল্যাণে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। সারাদেশের স্কুল ও কলেজগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, আত্মহত্যা প্রতিরোধ, সাইবার বুলিং, স্কুল ভায়োলেন্স ও বুলিংসহ যৌতুক প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা আছে তাদের।

কাজের তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আসাদ জানান, আমাদের এই কাজ নিয়ে অনেকেই হাসাহাসি করেন। অনেকেই আমাকে সুইসাইড এনালিস্ট বলে তিরস্কার করেন। তবে আমি আনন্দ পাই মানুষের সাহায্য করে। আপনারাও এ বিষয়ে সচেতন হন ও অন্যদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনুন।

বদরুল মোর্শেদের দাবি, সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলা বা জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করুক বিনামূল্যে ও সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করুক।

চন্দ্রকোনা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রভাষক মহিউদ্দিন সোহেল ঢাকা মেইলকে বলেন, সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ, সংগঠনটির কাজ খুব ভালো লেগেছে। হতাশাগ্রস্ত মানুষদের তারা অনলাইন ও অফলাইন দু'ভাবেই সহায়তা করছে। এমন জনসচেতনতা মূলক কাজ করছেন যারা, তাদের জন্য শুভ কামনা।

খুব শিগগিরই ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সেবা চালু করবে সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে যারা কাজ করতে আগ্রহী, তাদেরকে সব সময় পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জানিয়েছেন ‘সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ’ এর সহ প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বদরুল মোর্শেদ আসাদ।

প্রতিনিধি/এইচই