শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়েছিলেন খলিলুর রহমান খান

বিধান মজুমদার অনি
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২২, ০৫:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়েছিলেন খলিলুর রহমান খান
ছবি : ঢাকা মেইল

২ মার্চ ১৯৭১। সকাল ১১টা। মাদারীপুর নাজিমউদ্দীন কলেজ ক্যাম্পাস। কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে ঢুকেন এক তরুণ। তাদের চোখে-মুখে ছিল শুধুই মুক্তির নেশা। তারা এসেই কলেজ ক্যাম্পাসের মূল ভবনের সামনে দাঁড়ালেন। খুঁটিতে বাঁধা পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলেন। কলেজের মাঠে পতাকাটি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন।

৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তখনকার সময়ে মাদারীপুরে ছিলো না তেমন টিভি-রেডিও। সেই ভাষণটি আর সেদিন তাঁর শোনা হয়নি। পরের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি অডিও ক্যাসেট লঞ্চে করে আসে। বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ শুনে নিজেকে দেশের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন।


বিজ্ঞাপন


সেই তরুণটির নাম খলিলুর রহমান খান। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মাদারীপুরের মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার, খলিল বাহিনীর প্রধান। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে এক আতঙ্কের নাম।

আজিজ খান ও জরিনা বেগমের ৫ সন্তানের মধ্যে সেজো সন্তান খলিলুর রহমান খান। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ বছর বয়সে পা দিয়েছেন তিনি। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন কিছুদিন হলো। মা জরিনা বেগমের অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন খলিলুর রহমান।

শহরের চাঁদমারি এলাকায় আনসার পুলিশের ফায়ারিং স্কোয়াড মাঠ ও নাজিমউদ্দীন কলেজ মাঠে শুরু হয় তাঁদের প্রশিক্ষণ।   নতুন শহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৈয়দ শরীফ বাঁশের তীর ধনুক ও লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ মাদারীপুরে আসেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি কর্ণেল শওকত আলী। তিনি এসে মাদারীপুর জেলার ৯টি থানার প্রায় দুই হাজারের বেশি যুবকদের একত্রিত করেন। 

১৩ এপ্রিল তাঁদের সবাইকে নেওয়া হয় নাজিমউদ্দীন কলেজ মাঠে। এখানে তাঁরা শারীরিক কসরত চালাতে থাকেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১৬৫ জনকে যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ১৬৫ জনের মধ্যে ছিলেন খলিলুর রহমান খান, হাবিবুল্লাহ খোকন, মুমিনুজ্জামান খান, সাজেদুল হক চৌধুরী, আবদুল জলিল বেপারী, বাচ্চু ভূইয়া, মোসলেম খান, মোনাচ্ছেব শরীফ, হারুনূর রশীদসহ আরও অনেকে।


বিজ্ঞাপন


তিনি সাথে নিয়ে আসেন নানা ধরনের পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র। দেশে এসেই শুরু হয় পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কয়েক মাসের মধ্যে মাদারীপুরে সাড়া ফেলে দেয় খলিল ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের দলের নাম হয় ‘খলিল বাহিনী’।

১৭ এপ্রিল স্টুয়ার্ড মুজিব তাঁদেরকে নেওয়ার জন্য আসেন। স্টুয়ার্ড মুজিব হলেন ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আরেক আসামি। তিনি খলিলুর রহমানসহ সবাইকে নিয়ে লঞ্চে শরীয়তপুরের ডামুড্যা যান। সেখান থেকে নীলকমল, নীলকমল থেকে নোয়াখালী। সেখান থেকে যান কুমিল্লা, কুমিল্লা থেকে সরাসরি বেলুনিয়া সীমান্ত হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে যান। সেখান থেকে প্রশিক্ষণের জন্য কাঁঠালিয়া যান তাঁরা। কিন্তু কাঁঠালিয়া ক্যাম্প বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় তাঁদের নেওয়া হয় অম্পিনগর ক্যাম্পে। সেখানেই তাঁদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়।

১৭ মে-তে খলিলুর রহমান খানকে নিয়ে আসা হয় নাইনটি ওয়ান বিএসএফ ক্যাম্পে। সেখানেই ২নং সেক্টর কমা-ার খালেদ মোশাররফের সাথে তাঁর দেখা হয়। সেখানে ছিলেন বিএসএফ কমা-ার সাবেক সিং। তাঁরা তাঁদের দিকনির্দেশনা দেয় কীভাবে কী করতে হবে। সিদ্ধান্ত এলো এখান থেকে ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা ঢুকবেন মাদারীপুরে। তাঁদের ৪টি দলে ভাগ হয়ে জেলার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। ৫ জনের জন্য ১টি স্টেনগান, ২টি গ্রেনেড,  ১টি করে বেয়নেট দেওয়া হয়। 

২৯ মে তারা ২১ জন নির্ভয়পুর ক্যাম্পে গিয়ে লেফটেন্যান্ট মাহাবুবের নেতৃত্বে মাদারীপুরে ঢোকার প্রস্তুতি নেন। তবে ঢোকাটা খুব স্বাভাবিক ছিলো না। চারিদিকে তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনির তাণ্ডব লীলা চলছে। যেখানের যাকে পায় তাকে হত্যা করছে। চারিদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ। খলিলুর রহমানরা প্রতিজ্ঞা করে ফেলেন যেভাবেই হোক ফেরতে হবে দেশে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিকে। তাঁরা আগরতলা হয়ে, কুমিল্লা দিয়ে কখনো হেঁটে, কখনো নৌকায় করে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে মাদারীপুরে আসেন। 

সমাদ্দার এলাকায় মোট ৩ দিন ২ রাত সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করাতে সক্ষম হন খলিল ও তার বাহিনী। সমাদ্দারের এই সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দিতে হয় ৯০ জন বাঙালির। মারা গিয়েছিলো ১৭ জন পাকিস্তানি সেনা। বাকিরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

তবে এসে খলিলুর রহমান খান বুঝতে পারলেন মাদারীপুরকে হানাদার মুক্ত করতে সম্মুখযুদ্ধের বিকল্প নেই। তিনি তার ২০ সহযোগীদের রেখে আবার চলে যান ভারতে। এবার তিনি সাথে নিয়ে আসেন নানা ধরনের পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র। দেশে এসেই শুরু হয় পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কয়েক মাসের মধ্যে মাদারীপুরে সাড়া ফেলে দেয় খলিল ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের দলের নাম হয় ‘খলিল বাহিনী’। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে থাকে। খলিল বাহিনী মাদারীপুরে পাক বাহিনীর কাছে হয়ে ওঠে এক ত্রাসের নাম। খলিল বাহিনী সদর উপজেলার কলাগাছিয়া গ্রামে ৪টি ক্যাম্প গড়ে তোলে। এক সময় তাদের বাহিনীতে মোট ৪০০ জনের অধিক মুক্তিযোদ্ধা যোগ দেন। তাদের বাহিনীর সদস্যদের প্রধান কাজ ছিলো পাক হানাদার বাহিনীকে ভিত্ সন্ত্রস্ত রাখা। সাথে পাকবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। 

খলিলুর রহমান খান মাদারীপুরের বিভিন্ন জায়গায় পকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করেছেন, তাঁতিবাড়ি এলাকায় মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হানাদার বাহিনীর জিপ ধ্বংস করেন। এসময় বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহতও হোন তিনি। এছাড়া তার নেতৃত্বে সিদ্দিকখোলা ব্রিজ, ইটেরপোল এলাকার বিদ্যুৎ অফিস, এআর হাওলাদার জুট মিলের পাকিস্তানি ক্যাম্পে গেরিলা পদ্ধতিতে হামলা চালায় তার খলিল বাহিনী। তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের। 

১০ ডিসেম্বর। সমাদ্দার এলাকা। পাকিস্তানিদের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ চলছে খলিল বাহিনীর। সন্ধ্যা নেমেছে। পশ্চিম আকাশের লাল আভাটা জ্বলজ্বল করছে। এর মধ্যে পাকিস্তানিদের মেজর আব্দুল হামিদ ঘটক সাদা পতাকা উড়িয়ে তার ৩৭ জন পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে খলিল বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। সমাদ্দার এলাকায় মোট ৩ দিন ২ রাত সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করাতে সক্ষম হন খলিল ও তার বাহিনী। সমাদ্দারের এই সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দিতে হয় ৯০ জন বাঙালির। মারা গিয়েছিল ১৭ জন পাকিস্তানি সেনা। বাকিরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান খানের বয়স এখন ৬৮ বছর। স্ত্রী ও ২ সন্তান মিলে তাঁর সংসার। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে থাকেন গ্রিসে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পেয়েছেন স্বীকৃতি। মানুষের কাছ থেকেও পাচ্ছেন সম্মান। তাঁর সেই তারুণ্য এখনো ধরে রেখেছেন। 

খলিলুর রহমান খান বলেন, আমরা দেশের জন্য করেছি। তবে একটা ব্যাপার খারাপ লাগে নতুন প্রজন্ম এখন আর মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চায় না। আমি মনে করি এটা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যর্থতা। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। প্রতিটি কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচিত আগামী প্রজন্মের কাছে এই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসগুলো তুলে ধরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুর রহমান রাব্বি বলেন, খলিলুর রহমান খান আমাদের মাদারীপুরের গর্ব। আমরা ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে তার দুঃসাহসিক বীরত্বের কথা শুনেছি। যতোদিন এই দেশ থাকবে, তাঁর অকুতোভয় দুঃসাহসী সংগ্রামের কথা মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর বীরত্বের কথা মাদারীপুরবাসী কোনোদিন ভুলবে না।

মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, খলিলুর রহমান খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যুদ্ধকালীন খলিল বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সমাদ্দার এলাকায় যুদ্ধে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছিলো।

এইচই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর