সবজি হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় মিষ্টি কুমড়া এখন পাহাড়ের চাষিদের কাছে লাভজনক হয়ে উঠেছে। আগে বান্দরবান জেলায় পাহাড়ের ঢালুতে জুমে মিষ্টি কুমড়া সাধারণত সাথীফসল হিসেবে চাষ করা হত। তবে ইদানিং জুমের জায়গায় আলাদা করেই মিষ্টি কুমড়া প্রচুর চাষ করা হচ্ছে। সেগুলো ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি দেখা যায়, বান্দরবান টু লামা সড়কের টংকাবতী ইউনিয়ন, সুয়ালক ইউনিয়ন ও চিম্বুক-নীলগিরি সড়কের ধারে বিভিন্ন পাড়া গ্রাম থেকে নারী-পুরষ শ্রমিক থ্রুং (ঝুড়ি) ভর্তি মিষ্টি কুমড়া উঁচু পাহাড়ের ঢালু জায়গার এনে রাখছেন। কেউ ওজন মেপে দিচ্ছেন, আর কেউ ট্রাকে ভরছেন। এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
ক্রাপ পুং ম্রো কারবারি (৬০) সাক্কয় পাড়ায় মাত্র ২ একর জুমের জায়গায় মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন। জানালেন, প্রতি মণ ৬ শত টাকায় একশত ত্রিশ মণ কুমড়া বিক্রি করেছেন। আরও একশ মণ পাওয়ার আশা করছেন। যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে এক লাখ টাকার মতো লাভ হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, তার পাড়ার ৪০ পরিবারের সবাই মিষ্টি কুমড়া, শসা, করলা ও বরবটি চাষ করেছেন।
ক্রাপ পুং ম্রো বলেন, ‘জুমের জায়গা কমে যাচ্ছে, এখন অনেকেই স্থায়ী ফলদ বাগান করছেন। জুমে ধান করলে হাতি আর বানর জুমে ফসলাদি নষ্ট করে দেয়। মিষ্টি কুমড়া চাষ করলে হাতি আসে না, বানরেও সমস্যা করে না, আর মিষ্টি কুমড়া চাষে লাভবানও হওয়া যায়।’
টংকাবতী ইউনিয়নের ব্রিকফিল্ড পাড়া নিবাসী রিং রাও ম্রো (২২) তিনএকর জায়গায় মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন। এবছর এ যাবৎ প্রতি মণ ছয়শ টাকা করে আড়াই শ মণ মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করেছেন। আরও দেড় শ মণ পাবেন বলে আশা করছেন।
লামা-সুয়ালক সড়কে দেখা গেল, ভর দুপুরে তপ্ত রোদে নারী-পুরুষ শ্রমিকেরা পাহাড় ডিঙিয়ে ঝুড়ি ভরে মিষ্টি কুমড়া রাস্তার ধারে আনছেন। এসময় টুম্পা রাও ম্রো (২৫) নামের এক নারী শ্রমিক জানান, জুম থেকে রাস্তায় এনে দেওয়ায় মণ প্রতি তারা একশ টাকা পেয়ে থাকেন। একবারে এক মণ বহন করা যায়, সারাদিন আট থেকে নয়বার আনা যায়। অর্থাৎ, প্রতিদিন ৮-৯শ টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি।
টংকাবতী ইউনিয়ন ও সুয়ালক ইউনিয়নে লামা সুয়ালক সড়কের ধারে, হাঙ্গর খালের তীরে দেখা মিলল বস্তায় ভরে, রাস্তার ধারে শুধু মিষ্টি কুমড়ার স্তুপ।
ইয়ং রাও ম্রো (৩৫) নামের একজন বলেন, সাক্কয় পাড়া, বলি পাড়া, অংহ্লা পাড়া, রমজু পাড়াসহ এমন কোনো পাড়া নেই, যেখানে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হচ্ছে না। সবাই কম-বেশি চাষ করছেন এবং লাভবানও হচ্ছেন।
ছয় একর জায়গায় মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন অংহ্লা ম্রো (৫৫)। প্রতি মণ ৬শ টাকা করে বিক্রি করেছেন। এ বছর কত মণ পাবেন প্রশ্ন করা হলে, ‘তিনি বলেন এ বছর তেমন ভালো হয়নি, তারপরও এখন পর্যন্ত তিনশ চল্লিশ মণ বিক্রি করেছি। আরও দুই-আড়াইশ মণ পাবেন বলে আশা করছি।’
যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে এবছর দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ হবে বলেও জানান অংহ্লা ম্রো।
ব্রিকফিল্ড এলাকা ব্যবসায়ী রিপিয়ো ম্রো (২৬) জানান, ছয় শ টাকায় কিনে প্রতি মণ বিশ টাকা কমিশন পেয়ে থাকেন তিনি।
ঝুলন দাশ (৪০) নামের এক ব্যবসায়ী জানান, সারাদেশে বান্দরবানের মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বান্দরবানের মিষ্টি কুমড়া স্বাদে অতুলনীয়। এখান থেকে তিনি একাই দৈনিক দুই ট্রাক মিষ্টি কুমড়া নিয়ে যান।
তিনি আরও জানান, ছয়শ চল্লিশ টাকা প্রতিমণ মিষ্টি কুমড়া কিনে কুমিল্লা নিমসা বাজারে নিয়ে সব খরচ বাদে সাতশত পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করেন।
সুয়ালক টোলট্যাক্স আদায়ের দায়িত্বরত মো. শাহেদ জানান, প্রতিদিন ৮-১০ ট্রাক মিষ্টি কুমড়া বান্দরবানের বাইরে যায়।
বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, জেলায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২২৯ হেক্টর জায়গায় মিষ্টি কুমড়ার আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ৩৭৮১ মেট্রিক টন, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২৪২ হেক্টর জায়গায় আবাদ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছিল ৪১৫৪ মেট্রিক টন, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে আবাদ হয়েছে ২৪৮ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছে ৪৫১২ মেট্রি টন।
বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, বান্দরবানের মিষ্টি কুমড়া বারোমাসি জাতের। এগুলো অত্যন্ত সু-স্বাদু এবং দেশব্যাপী চাহিদাও আছে।
বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ হয় উল্লেখ করে এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, বান্দরবানের মিষ্টি কুমড়া অনেকদিন সংরক্ষণ করা যায়, নষ্ট হয় না, আপদকালীন সবজি হিসেবেও খ্যাতি আছে।
প্রতিনিধি/এএ




