শামুকখোল পাখির কলতানে মুগ্ধ যে গ্রাম

পারভীন লুনা বগুড়া 
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০২ পিএম
শামুকখোল পাখির কলতানে মুগ্ধ যে গ্রাম
ছবি : ঢাকা মেইল

রামনগর। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর কলকাকলিতে মুখরিত বগুড়ার শেরপুরের উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পাখিপ্রেমীরা। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখে মনে হবে এ যেন পাখি স্বর্গরাজ্য।

রামনগরে এলে যে কেউ দেখতে পাবেন সেখানকার গাছে গাছে শামুকখোল পাখির অবাধ বিচরণ। মা পাখিরা ব্যস্ত বাচ্চাদের সামলাতে। আবার বাবা পাখিরা ব্যস্ত খাবার ও বাসা তৈরিতে। আর অন্য পাখিদের সময় কাটছে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। 

বিরল প্রজাতির শামুকখোল পাখি। সারস জাতীয় পাখি এটি। স্থানীয়দের কাছে শামুক ভাঙা, হাইতোলা মুখ—এসব নামেও পরিচিত। খাল-বিলের ছোট ছোট শামুক-ঝিনুক, ছোট মাছ, আর ফসলের মাঠের পোকামাকড় খেয়ে জীবন বাঁচায় শামুকখোল পাখি।

SHAMUKH PAKHI

রামনগর সেই পাখির অভয়ারণ্য। পাখিদের অতি যত্ন দিয়ে আগলে রেখেছে পাখিদের গ্রামবাসী। আর এই পাখিদের যাতে কেউ বিরক্ত না করে সেজন্য এগিয়ে এসেছে বন ও পরিবেশ অধিদফতর। এ ব্যাপারে গ্রামের মানুষ সহায়তা করছে পরিবেশ অধিদফতরের লোকজনকে।

নিরাপদ আশ্রয়, আর মানুষের ভালবাসায় পাখির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ৫ বছর ধরে চলছে পাখি ও মানুষের এই মিতালি। ঘন বাঁশঝাড়, আমগাছ, শিমুলগাছসহ অর্ধমাইল জঙ্গলে শামুখখোল পাখির নিরাপদ আশ্রয়। শীতের মৌসুমে এ পাখি চলে যায়। দেখা মেলে না ৩ থেকে ৪ মাস। বর্তমানে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রজননও করছে পাখিগুলো। ফলে দিন দিন বাড়ছে পাখির সংখ্যা। 

গোটা গ্রামের মানুষ নিরাপত্তা দিয়ে আগলে রেখেছে পাখিদের। তবে কোনোভাবেই পাখিকে উপদ্রব করা চলবে না। এখানে পাখি শিকার নিষিদ্ধ। এখানে কোনো ধরনের বন্দুক, ইয়ারগান ও ফাঁদ বহন করা চলবে না। পাখিশিকারিদের ঠেকাতে এখানে গ্রামবাসী অত্যন্ত সচেতন ও তৎপর। 

shamkukh

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুব ভোরে পাখিরা জেগে ওঠে। কিচিরমিচির করে। সকাল-বিকাল এক চমৎকার পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পাখিগুলো ডানা মেলে ওড়ে। পোকামাকড়সহ খাদ্যের খোঁজে মাটিতে নামে। উড়ে যায় বিলে। সন্ধ্যার আগে আগে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ফিরে আসে নীড়ে। ৫ বছর ধরে তারা পরম মমতায় পাখির দেখভাল করে আসছেন।

হোসেন, আলাল নামের দুই যুবক বলেন, গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তার দুই ধার ঘেঁষে জলপাইগাছ, আকাশমনি, বাঁশঝাড়, শিমুল, আমগাছ, ও জঙ্গলে পাখি বাসা তৈরি করে। ৫ বছর ধরে এখানে পাখি বসবাস করছে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এই গ্রামে। এখানে শীতকালীন সময়ে অনেক প্রজাতির পাখি আশ্রয় নেয় এই গ্রামে। 

মামুন নামের আরেকজন যুবক বলেন, শীতের সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি থাকে এখানে। আর এই গরম সময়ে শামুখখোল পাখি প্রজনন দেওয়ার জন্য বাসা বাঁধে। এই পাখি ছাড়া অন্য পাখি তেমন চোখে পড়ে না। 

shamikh

শামুখখোল পাখির বিষ্ঠা ছড়ায় লোকালয়ে। তাতে গাছের পাতা নষ্ট হয়ে যায়। ঘরের টিন নষ্ট হয়। গাছের ফল আম, জলপাই, আমড়া এগুলো খেতে পারে না গ্রামের মানুষ। পাখিরা খেয়ে ফেলে। তবুও গ্রামের মানুষরা পাখিদের দেখভাল করে। পাখির ওপর অন্য রকম এক মায়া পড়েছে তাদের। 

২০১৪ সালের পর থেকে এখানে স্থানীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাখি পরিযায়ন ঘটিয়ে বাচ্চাপ্রসবে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সময়ের সাথে এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। 

প্রতিবছরই পাখিরা বাচ্চা উৎপাদনের পর বড় করে পুনরায় পরিযায়ন ঘটায়। বর্ষার শেষে প্রজনন সময়কালে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের পর বাচ্চাগুলো বড় হলে বাসা ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। প্রতি বছর প্রাকৃতিক কারণে কিছু বাচ্চা শুরুতেই প্রাণ হারায়। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সব মোকাবেলা করে টিকে যায়। 

শামুখখোল সংরক্ষণে ‘তীর’
২০১৬ সাল থেকে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা গড়ে ওঠা পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তীর’-এর নজরে আসে পাখিগুলোর পরিযায়ন ও বাচ্চা উৎপাদনের বিষয়টি। সেই সময়ে এর সংখ্য কয়েক শ ছিল। কিন্তু পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য ছিল চোখে পড়ার মত। 

পাখি শিকার বন্ধ ও মানুষকে পরিবেশ নিয়ে সচেতন করতে তৎকালীন তীর সদস্যরা মানুষকে পাখি শিকার বন্ধে ও সচেতন করতে আহ্বান জানাতে থাকে। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় গ্রামবাসী আজ অনেকটায় সচেতন পাখি শিকার বিষয়ে। সেই সঙ্গে এক এক করে গড়ে উঠেছে এক হাজারের বেশি পাখির প্রজননকালীন আবাস্থল ‘তীর-রামনগর পাখি কলোনি’।

shamukh

তীর সদস্যরা বগুড়ার দশ মাইল এলাকার রামনগর পাখি কলোনিতে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে আসছে। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছরে অল্পঅল্প করে মানুষের মধ্যে সচেতনতার বীজ বোপণ করে আসছে তারা। মানুষের সহযোগিতা একটি একটি করে প্রতি বছর পাখিগুলোর আবাসস্থল বৃদ্ধি পেতে পেতে গাছের সংখ্যা হয়েছে ৪২ টি। এবছর শামুকখোল পাখির এই কলোনীটিতে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির ৪২ টি গাছে পাখিগুলো বাচ্চা প্রদান ও বড় করে তোলার জন্য বেছে নিয়েছে। 

যার মধ্যে সবগুলোই দেশীয় প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে জলপাই, পিতরাজ, আম, কাঁঠাল, মেহগনী, অশ্বথ, শিমুল, বট প্রভৃতি গাছ রয়েছে। গড়ে ৫০০টি বাসায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি পাখির অবস্থান আছে।

সুসংবাদ হল তীরের সদস্যদের ও স্থানীয়দের সচেতনতায় শখের পাখি শিকার শূন্যে কোঠায়। স্থানীয়ভাবেই মানুষ এই পাখি কলোনি সংরক্ষণে সচেতন।

তীরের সাংগঠনিক সম্পাদক হোসেন রহমান জানান, আমরা স্থানীয়দের মাঝে পাখি কলোনিগুলোতে বাসা বানানোর উপযোগী চারা বিতরণ করি। এব ছর তীরের রক্ষণাবেক্ষনে থাকা পাখি কলোনি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ শতাধিক চারা বিতরণ করা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে বিশেষ করে বর্ষাপূর্ব বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে দশ হাজার দেশীয় চারা গাছ সংগ্রহ, বিতরণ ও রোপণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তীর।

তিনি বলেন, শামুকখোল পাখি কলোনির সংরক্ষণের বাস্তব ও প্রকৃত তথ্যচিত্র ও সুফল সামনে আনার লক্ষ্যে সামনের দিনগুলোতে কলোনীর আবাস্থল গণনা ও পাখি সুমারির কার্যক্রম বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাণিবিশেষজ্ঞের মত
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইকবাল জানান, শামুকখোল বড় কলোনি তৈরি করে রাত্রিযাপন করে। অল্পবয়সী শামুকখোল পাখি উড়তে শেখার পর শত শত মাইল উড়ে ভ্রমণ করে। এরা ভোরে আবাস ছেড়ে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়, ডানা ঝাপটিয়ে দল বেঁধে জলাভূমির দিকে উড়ে যায়। দিনের গরম সময়গুলোতে বিশেষ কৌশলে চক্রাকারে আকাশের উঁচুতে উঠে যায়। এরা পানির ধারে, অল্প পানি অথবা পানির উপরে ভাসমান কিছুর ওপর চুপ করে থাকে শিকার ধরতে। এছাড়া অগভীর পানিতে হেঁটে হেঁটে কাঁদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খোঁজে। এদের খাদ্য তালিকার ৯০ ভাগ শামুক। এছাড়া এরা ছোট মাছ, বড় আকারের পোকা, কাঁকড়া, ব্যাঙ খেয়ে জীবন ধারণ করে।

shamukh

শামুকখোল পাখি যৌন মিলনের সময় ঠোঁটে ঠোঁটে পেটাপিটি করে। তখন দেখতে অনেকটা লাঠিখেলার দৃশ্যের মতো মনে হয়। তখন জোরে ঠকঠক শব্দ শোনা যায়।এরা আমাদের এলাকায় এসে ফসলি জমিতে খাদ্যের সন্ধানে গিয়ে কীটপতঙ্গগুলো খেয়ে ফেলে। এটা আমাদের আবাদের জন্য ভালো দিক। আরেকটি ভালো দিক হলো যে এলাকায় এই শামুকখোলের কলোনি গড়ে উঠেছে সে এলাকায় পর্যটন স্পটের মতো গড়ে উঠেছে। অনেকেই তাদের মন ভালো করতে কলোনিতে যাচ্ছেন। প্রকৃতির সঙ্গে কিছু সময় কাটাচ্ছেন। আমি মনে করি এদের রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ময়নুল ইসলাম বলেন, রামনগর গ্রামে পাখির অভয়ারণ্য গড়তে সহযোগিতার কোনো কমতি থাকবে না। 

প্রতিনিধি/এইচই