রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মোবাইল অ্যাপে গরু পালন: নওগাঁর খামারে আধুনিক প্রযুক্তি

সুমন আলী, নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

মোবাইল অ্যাপে গরু পালন: নওগাঁর খামারে আধুনিক প্রযুক্তি

সনাতন পদ্ধতির খামার ব্যবস্থাপনাকে পেছনে ফেলে নওগাঁয় যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। খামারের পরিচর্যা থেকে শুরু করে গরুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা—সবকিছুই এখন চলে এসেছে মুঠোফোনে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ বা আইওটি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে দূর থেকেই খামার পরিচালনা এবং পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খামারিদের যেমন সময় ও শ্রম বাঁচছে, তেমনি লোকসানের ঝুঁকি কমছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’র বাস্তবায়নে নওগাঁ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের তরুণ খামারি নূরে আলমের খামারে স্থাপন করা হয়েছে এই আইওটি প্রযুক্তি।

নূরে আলমের খামারে প্রথাগত ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে পুরো খামার পরিচালিত হচ্ছে স্মার্ট সেন্সরের মাধ্যমে। সেন্সরগুলো ২৪ ঘণ্টা খামারের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এসব ডেটা মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে খামারির মুঠোফোনের অ্যাপ বা মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গবাদিপশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার জন্য খামারের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত গরমের কারণে গবাদিপশু প্রায়ই ‘হিট স্ট্রেস’-এ ভোগে, যার ফলে দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, গ্রামগঞ্জে দক্ষ খামার শ্রমিকেরও সংকট রয়েছে। আইওটি প্রযুক্তি এই দুই বড় চ্যালেঞ্জের স্থায়ী সমাধান এনে দিয়েছে।

S

খামারে তাপমাত্রা বা আর্দ্রতার কোনো অস্বাভাবিক তারতম্য ঘটলে কিংবা অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বাড়লে খামারির মোবাইলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা (অ্যালার্ট) চলে আসে। শুধু তা-ই নয়, অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকেই খামারের ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট, স্প্রিংকলার ও এক্সহস্ট ফ্যান চালু বা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে খামারের ভেতরের পরিবেশ সব সময় পশুর অনুকূলে রাখা এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়েছে।

প্রযুক্তির সুফল নিয়ে খামারি নূরে আলম বলেন, ‘আগে আবহাওয়া খারাপ হলে বা অতিরিক্ত গরমে গরু অসুস্থ হয়ে পড়ত। খামারে গ্যাস জমেছে কি না, তা বুঝতে পারা কঠিন ছিল। এখন সেন্সরের মাধ্যমে ফোনের অ্যাপেই সব তথ্য পেয়ে যাই। দূরে থাকলেও মোবাইল থেকে ফ্যান বা স্প্রিংকলার চালু করে দিতে পারি। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা যেমন কমেছে, তেমনি গবাদিপশুর রোগবালাই কমে উৎপাদনও অনেক বেড়ে গেছে।’

স্থানীয় খামারি একরামুল হক জানান, ‘হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে খামার সামলানো এবং গরুর সুস্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখা সবসময় আমাদের জন্য কঠিন ছিল। এখন দেখি মোবাইল ফোনের অ্যাপ দিয়েই খামারের ফ্যান আর তাপমাত্রা সব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। এটা দেখে সত্যি অবাক হয়েছি। আমাদের মতো প্রান্তিক খামারিদের খামারে যদি এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায়, তবে লোকসানের ঝুঁকি আর থাকবে না।’

উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’র প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নূর হোসেন বলেন, ‘গরুর খামারে আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহার গবাদিপশু পালনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রথাগত খামারে হিট স্ট্রেস ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে পশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতো, যা খামারিদের বড় ঝুঁকিতে ফেলত। গোবিন্দপুরের খামারি নুর এ আলম এখন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পিকেএসএফের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে খামারের ঝুঁকি কমিয়ে এটিকে লাভজনক ব্যবসায় রূপ দেওয়া সম্ভব।’

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গবাদিপশু পালনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। প্রথাগত পদ্ধতিতে তাপমাত্রা বা হিট স্ট্রেসের কারণে খামারিরা প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। নওগাঁর গোবিন্দপুর গ্রামের এই খামারে আইওটি প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ আমাদের ডেইরি খাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর থেকে আমরা এ ধরনের প্রযুক্তিভিত্তিক খামারগুলোকে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সবসময় প্রস্তুত আছি।’

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর