রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ফেলে দেওয়া আমের খোসায় তৈরি হচ্ছে ‘ম্যাংগো পিল টি’

মো. ফারুক হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ 
প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

ফেলে দেওয়া আমের খোসায় তৈরি হচ্ছে ‘ম্যাংগো পিল টি’

দেশের সর্ব উত্তর-পশ্চিমের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানেই আম আর আমের সুবাস। তবে চাহিদার তুলনায় ব্যাপক উৎপাদন এবং কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেক সময় চাষিদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। 

ঠিক এমন এক বাস্তবতায় জেলার ভোলাহাট উপজেলার তিন শিক্ষিত তরুণ আম নিয়ে শুরু করেছেন ব্যতিক্রমী এক গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। আমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তাঁর তৈরি করেছেন নতুন স্বাদের চা, নাম দিয়েছেন ‘ম্যাংগো পিল টি’। দেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন অভিনব উদ্যোগ।

অল্প পরিসরে শুরু হওয়া এই চা ইতোমধ্যে স্থানীয় চা-প্রেমী ও দোকানিদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছে।

S

যেভাবে শুরু এই পথচলা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পড়াশোনা শেষ করে মোহা. মাইনুল ইসলাম ফ্রিল্যান্সিং ও গ্রাফিকস ডিজাইনিংয়ের পাশাপাশি আম নিয়ে কিছু করার পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে এআই ও বৈশ্বিক নানা পরিবর্তনের কারণে ফ্রিল্যান্সিংয়ে ধাক্কা খেলেও দমে যাননি তিনি।

২০২১ সালে আমের দাম না পেয়ে চাষিদের দুর্ভোগ দেখে তিনি নিজ উদ্যোগে আম সংরক্ষণের পরিকল্পনা করেন। বিনা পুঁজিতে বন্ধু মিঠুনকে সঙ্গে নিয়ে আমসত্ত্ব বানানোর চেষ্টা করলেও খোলা মাঠে শুকানো ও ধোঁয়া বা পশুর লোমের কারণে শুরুতে হোঁচট খান তারা। বড় ভাই ও বন্ধু মাসুমকে ইনভেস্টর হিসেবে যুক্ত করে আম শুকানোর যন্ত্রের খোঁজ নিলে ১১ লাখ টাকা দাম শুনে তারা নিজেরাই তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর ইন্টারনেট ঘেঁটে নিজেদের মেধা ও প্রযুক্তির সাহায্যে মাত্র ৫ লাখ টাকায় নিজেরাই বানিয়ে নেন আধুনিক হিটার মেশিন। এই দেশীয় যন্ত্র দিয়েই গত বছরের ৭ জুলাই থাই কোয়ালিটির ড্রাই ম্যাংগো তৈরিতে সফল হন তারা। ড্রাই ম্যাংগোর পাশাপাশি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ম্যাংগো লেদার, সস ও পাউডার তৈরির পথ ধরে এবার তারা তৈরি করলেন আমের খোসার চা ‘ম্যাংগো পিল টি’।

উদ্যোক্তারা জানান, এক মণ (৪০ কেজি) আম প্রক্রিয়াজাত করার পর যে খোসা অবশিষ্টাংশ হিসেবে থাকে, তা থেকে প্রক্রিয়াজাত করে মাত্র এক কেজি ‘ম্যাংগো পিল টি’ উৎপাদন করা হয়।

S

প্রথমে আম ভালোভাবে কীটনাশকমুক্ত করে ধুয়ে খোসা ছাড়ানো হয়। এরপর মূল আম দিয়ে অন্যান্য পণ্য এবং খোসাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শুকিয়ে ও বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে গুঁড়া করে তৈরি করা হয় এই চা। মান ও ধরনভেদে স্থানীয় বাজারে এই চা দুই থেকে চার হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, এ চায়ে যেমন রয়েছে আমের চমৎকার ঘ্রাণ ও স্বাদ, তেমনই রয়েছে পুষ্টিগুণ।

কানসাটের আমচাষি নাদিম হোসেন জানান, আমের নায্যমূল্য না পাওয়ার এই সময়ে আম থেকে এ ধরনের বহুমুখী পণ্য ও চা তৈরি হলে আমের কদর ও দাম দুটোই বাড়বে, যা জেলার অর্থনীতিকে আরও মজবুত করবে।

ভোলাহাটের স্থানীয় চা-দোকানি আব্দুল আলিম বলেন, ‘যারা একবার এই চা পান করেছেন, তারা বারবার আসছেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় আমাদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে।’

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ ও স্থানীয় প্রতিনিধি সবিউল ইসলাম সবুজ জানান, এই চা পান করলে মনে হয় আস্ত আমই খাচ্ছেন, এর স্বাদ সত্যিই চমৎকার।

S

উদ্যোক্তা মিঠুন এই সাফল্যের পেছনে উপজেলা কৃষি অফিসার এবং আম গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিনের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। বেকার যুবকদের চাকরির পেছনে না ছুটে সম্ভাবনাময় এই খাত নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।

আরেক উদ্যোক্তা মাসুম আলী জানান, অর্থের অভাবে তারা বড় পরিসরে উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারছেন না। তবে প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারসংযোগ পেলে ‘ম্যাংগো পিল টি’ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।

ভোলাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সুলতান আলী বলেন, ‘আম শিল্পকে বাঁচাতে কৃষি বিভাগ সবসময় উদ্যোক্তাদের পাশে রয়েছে। ফেলে দেওয়া খোসাকে কাজে লাগিয়ে এই যুবকদের উদ্যোগ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হকও এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানান, কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ ও কর্মসংস্থান তৈরিতে এ ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগ দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। সব বাধা পেরিয়ে সম্ভাবনাময় এই ‘ম্যাংগো পিল টি’ কতদূর এগোয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।

প্রতিনিধি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর