রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বিডিআর বিদ্রোহে চাকরি হারিয়ে প্রবাসে, লাশ হয়ে ফিরলেন খোরশেদ

জেলা প্রতিনিধি, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

বিডিআর বিদ্রোহে চাকরি হারিয়ে প্রবাসে, লাশ হয়ে ফিরলেন খোরশেদ

বুকের ভেতর লালন করা একরাশ স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তীব্র আকুলতা নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিডিআর বিদ্রোহে চাকরি হারিয়ে প্রবাসে যাওয়া কুমিল্লার দেবীদ্বারের খোরশেদ আলম। কিন্তু ভাগ্য তাকে দুহাত ভরে শুধু ট্র্যাজেডিই উপহার দিল। ২০০৯ সালের বহুল আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহের জেরে চাকরি হারিয়ে চরম সংকটে পড়া কুমিল্লার দেবীদ্বারের সেই খোরশেদ আলম শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের আবহা শহরে দুই সুদানি নাগরিকের ছুরিকাঘাতে খুন হয়ে লাশ হয়ে দেশে ফিরলেন তিনি।

নিহত খোরশেদ আলম কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ভিড়াল্লা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের হাজী আনছর আলীর বাড়ির মৃত হাজী নুরুল ইসলামের ছেলে।

গত ১১ অক্টোবর সৌদি আরবে নিজ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে সুদানী আততায়ীর ছুরিকাঘাত নিহত হন তিনি।

শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল ১০টায় কু‌মিল্লার দেবীদ্বারের ভিরাল্লা নিজ গ্রামে অশ্রুসিক্ত নয়নে জানাজা শে‌ষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

পরিবার ও স্বজনরা জানান, পুরো জীবনটাই সংগ্রাম করে গেলেন মৃত খোরশেদ আলম। ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের কারণে চাকুরিচ্যুত হয়ে টানা দুই বছরের অধিক সময় কারাবরণ করেন। সেই সময় তিনি খাগড়াছড়িতে কর্মরত থাকলেও বিগত সরকারের জুলুমের শিকার হন তিনি। চাকরি হারিয়ে নতুন স্বপ্ন পূরণে সৌদি আরবে ২০১৭ সালে পাড়ি জমান।

সেখানে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে নেমেছিলেন।

সৌদির আভা শহরে একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন কাজ করতেন। দীর্ঘদিন মুয়াজ্জিনের কাজ করে একটি লন্ড্রির দোকান দেন। লন্ড্রির দোকানের অর্থ দিয়ে নিজ এলাকায় একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পুরো মাদ্রাসার শিক্ষা সামগ্রী থেকে সবকিছু তিনি নিজেই বহন করতেন। স্বপ্ন ছিল দ্বীনি শিক্ষা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার। কিন্তু সৌদি আরবে আততায়ীর ছুরিকাঘাতে সকল স্বপ্ন বিলীন হয়ে গেছে।

তারা আরো জানান, নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, মরুর দেশেও শান্তি মেলেনি খোরশেদের কপালে। গত ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় দোকানের বকেয়া টাকা আদায় নিয়ে তার দোকানের বাংলাদেশি কর্মচারীর সাথে সুদানের দুই নাগরিক ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে তাদের মারধর করে। খবর পেয়ে তিনি বাসা থেকে এসে ঝগড়া থামাতে গেলে সুদানী আততায়ীরা তাকে বুকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সৌদি পুলিশ দুই হত্যাকারীকে আটক করে। সেখানে বিচার কাজ চলমান রয়েছে। এবং দ্রুত তাদের ফাঁসি হবে বলে আশাবাদী পরিবার।

তার এই আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ আইনি জটিলতা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অবশেষে গত শুক্রবার দুপুরে তার নিথর দেহবাহী কফিনটি বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। যখন খোরশেদের লাশবাহী গাড়িটি দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ভিরাল্লা গ্রামে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের চোখের জলে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস।

নিহতের বড় মেয়ের জামাই নাজমুল হাসান বলেন, আমার শ্বশুরের কোনো ছেলে সন্তান নেই। আমার স্ত্রীসহ তারা চার বোন। এখন তারা পিতা হারিয়ে নিস্ব। তিনি বিনা দোষে বিডিআর বিদ্রোহের কারণে চাকরি হারান। সরকার তাকে কোনো সাহায্য সহযোগী করেননি। আমরা চাই তার চাকরির পেনশনের টাকা দিয়ে যদি সরকার আমাদের সহযোগিতা করে।

বিডিআর বিদ্রোহের ধাক্কায় জীবনের গতিপথ বদলে যাওয়া এই মানুষটির এমন মর্মান্তিক পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার পরিবার ও এলাকাবাসী। দেশ ও প্রবাসে বছরের পর বছর ধরে কেবলই লড়াই করে যাওয়া এক সৈনিকের এমন অকাল ও নিষ্ঠুর বিদায় যেন এক অনন্ত বেদনার গল্প হয়ে রইল দেবীদ্বারের মানুষের হৃদয়ে।

এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘খোরশেদ আলমের মৃত্যুর আমরা জেনেছি। লাশ আসা থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত খোঁজ রেখেছি।’

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর