কুড়িগ্রামে দরিদ্র পরিবারের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো- ভিক্ষুকের একাউন্টেও কোটি টাকার লেনদেন দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভুমিহীন আহিনা বিবির নামে একাউন্ট খুলে আত্মসাৎ করা হয় প্রায় ২৩ লাখ টাকা।
এভাবে ৮ জনের নামে একাউন্ট খুলে সিন্ডিকেট চক্রটি হাতিয়ে নেয় চার কোটি ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৬ টাকা। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আহিনা বিবি ন্যায়বিচারের আশায় অবশেষে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের ৮০ বছরের বেশি বয়সি বিধবা নবিরন বেওয়া ভিটেমাটি আর সম্পদ না থাকায় বসবাস করছেন ধরলা আবাসনে। গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করেই খেয়ে না খেয়ে চলছে তার দিন। অথচ কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে তাঁর নামে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ৯০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে একটি সিন্ডিকেট চক্র।
অসহায় এই বৃদ্ধার দাবি, ভাতা, গরু-ছাগল দেওয়ার কথা বলে এনআইডি, ছবি তুলে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। তার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা তুলে নেওয়া হলেও তিনি এসবের কিছুই জানেন না।
নবিরন বেওয়া (এনআইডিতে নাম- নবিরন বেগম) বলেন, ‘ভাতা দিবে কইয়া আমার আইডি কার্ড আর ছবি নিয়া গেছে। মুই ব্যাংকত যাং নাই, টাকাও তোলং নাই। এ্যালা শুনি হামার নামে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করছে। এ কথা শুনি টাসকি খাইচোং বা। একদিন ভিক্ষা না করলে মোর কপালত খাবার জোটে না। লাখ লাখ টাকা পাইম কোটে। মুই গরিব মানুষ, মুই এখন কী করিম তোমরায় কন?’
নবিরন বেওয়ার মতো অবস্থা আহিনা বিবির। তার নামেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে চক্রটি। আহিনা বিবির দাবি, সরকারি ভাতা করে দেওয়ার নাম করে দুজন ছাত্র আবাসনে এসে মানুষের কাছে এনআইডি ও ছবি তুলে নিয়ে যায়। এরপর কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপ-পুলিশ পরিদর্শক জুলফিকার হোসেন ২৩ লাখ টাকার আত্মসাত করার অভিযোগে একটি নোটিশ দিয়ে ডাকেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তখন জানতে পারি চট্রগ্রাম মেট্রোপলিটন প্রথম আদালতে আমার বিরুদ্ধে সি আর-১৪৩৩/২৫ মামলা বিগত ১৮/১২/২৫ তারিখে রুজু হয়। আদালত কাউন্টার টেররিজম পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। এরপরে বিগত ২৫-০৬-২৬ তারিখে আমি প্রথম কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে যাই। জানতে পারি আমার নামে একটি একাউন্ট (হিসাব নম্বর-১৫৫২১০১১৪৯৮৬০) খোলা হয়েছে এবং ঐদিন পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে ২২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮২ টাকা।
অথচ তিনি পূবালী ব্যাংকে না গেলেও কিভাবে একাউন্ট খোলা হলো এবং এসব টাকা লেনদেন হয়েছে কিংবা কারা করেছে, তিনি কিছুই জানেন না। তবে ইতিপূর্বে ০১৮৪২৪২৫৪৯৪ নম্বর থেকে ফোন করে ঐ ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে কথা বললেও ব্যাংকে এসে তাকে পাইনি।
দিনমজুর আহিনা বিবির ৭ জনের সংসারে হঠাৎ পুলিশি নোটিশ পেয়ে ঋণ করে চট্টগ্রাম গিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে আসে অসহায় এই পরিবারটি। পূবালী ব্যাংকে ভুক্তভোগীরা গেলেও তাদের কোনো সহযোগিতা না করে টাকা পরিশোধের পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রবীন হিতৈষী সংঘের সভাপতি এ কে এম সামিউল হক নান্টু বলেন, কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা আবাসনে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। এসব অধিকাংশ পরিবারের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো এখন মামলার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সঠিক তদন্ত করে সিন্ডিকেট চক্র শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজার এএইচএম আলমগীর কবির জানান, ‘বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন আছে। পুলিশী তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা যাবে না।’
কিন্তু ভুক্তভোগী ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই কিভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো এবং এতো টাকা লেনদেন হলো- এমন প্রশ্নের কোন জবাব দেননি তিনি। শুধুমাত্র আইনি জটিলতার অযুহাত দেখিয়ে নিশ্চুপ থাকেন।
প্রতারণার শিকার আহিনা বিবি বাদী হয়ে কুড়িগ্রাম চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০/১২ জন আসামির কথা বলা হয়েছে। তারা হলেন- শামীম বাবু শান্ত, আবুল হোসেন, সোহানুর রহমান সৈকত, নুর জামাল, আনিছুর রহমান আপেল ও রুহুল আমিন
কুড়িগ্রাম জজ আদালতের আইনজীবী ফারুক হোসেন সেতু বলেন, ‘দরিদ্র মানুষের এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা আদালতে মামলা করেছি। আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করি, প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়বে।’
তিনি আরও জানান, মামলায় ৮ জন দরিদ্র মানুষের নামে জাল জলিয়াতির মাধ্যমে কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে ৮টি হিসাব খোলা হয়। এসব হিসাব থেকে পরবর্তীতে ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫৬ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে নবিরন বেওয়ার হিসাব থেকে ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৮৮২ টাকা, শেফালী বেগমের হিসাব থেকে ৭৪ হাজার ৫৮৫ টাকা, ফরিদা বেগমের হিসাব থেকে ৫০০ টাকা, মকবুল হোসেনের হিসাব থেকে ৮৪ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬৮ টাকা, মেহের আলীর হিসাব থেকে ৯০ লাখ ৫৬৯ টাকা, বাচ্চু মিয়ার হিসাব থেকে এক লাখ, সাহিদা বেগমের হিসাব থেকে ৪০ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭০ টাকা এবং শিল্পী খাতুনের হিসাব থেকে এক কোটি ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২০০ টাকা আত্মসাৎ করে। আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ড বিধির -৪০৬/৪২০/৪১৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭৩/৪৭১/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনয়ন করা হয়।
আইনজীবী ফারুক হোসেন সেতু আরও বলেন, এটি একটি বড় সিন্ডিকেটের কাজ। এর সঙ্গে ব্যাংকের লোকজনও জড়িত থাকতে পারে। তদন্তে বিস্তারিত জানা যাবে। ইতিপূর্বেও কুড়িগ্রামে দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা কর হলেও অপরাধীরা ধরা পড়েনি। ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিধি/এএইচ




