শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পাহাড়ে জুম তোলার ব্যস্ততা, ফলন কমে যাওয়ায় চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

পাহাড়ে জুম তোলার ব্যস্ততা, ফলন কমে যাওয়ায় চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
রাঙামাটির বরকল উপজেলার আইমাছড়া ইউনিয়নে জুমের ধান তুলতে ব্যস্ত চাষিরা। ছবি: ঢাকা মেইল

জুম চাষ হল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের একটি ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি; যেখানে জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে এবং মাটিতে গর্ত খুঁড়ে একত্রে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করা হয়। সাধারণত প্রতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে পাহাড়ের ঢালু জায়গায় জুমের জায়গায় নির্ধারণ করে পরিষ্কার করে, ধান, তিল, ভুট্টাসহ বিভিন্ন সবজির বীজ বপন করা হয়। জুমের ধান ও সবজি পরিপক্ক হলে পাহাড়গুলো জুমের  ফসলে সবুজ হয়ে উঠে । সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে জুমের ধান কেটে ঘরে তোলা হয়। জুম থেকে পাওয়া ধান ও নানা পদের সবজি শুকিয়ে সারা বছর চলে জুমচাষিদের পরিবারগুলোর সংসার। 

ইতোমধ্যে জুমের সোনালী পাকা ধানে ছেয়ে গেছে পাহাড়। রাঙামাটি পাহাড়ে জুমচাষিরা এখন জুমের পাকা ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ততার সময় পার করছে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় অনেক জুমচাষি জুমের ধান কাটা শেষ করেছেন। অনেকে ধান মাড়াই করে জুম ঘরে মাচায় শুকানোর কাজ করছে, আবার অনেকে  ধান কাটার ব্যস্ততার সময় পার করছেন। তবে আগের মতো জুমের ফলন ভালো না হওয়ায় জুম চাষিদের কপালে দুশ্চিন্তার চাপ পড়েছে।

002

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড় এলাকার জুমচাষি ক্যসিনু মারমা বলেন, আগে আমরা এক আড়ি (ধান মাপার পাত্র) ধান রোপণ করলে ৫০ থেকে ৬০ আড়ি ধান পেতাম। কিন্তু এ কয়েকবছর থেকে এক আড়ি থেকে ধান পাচ্ছি মাত্র ২৫-৩০ আড়ি বা তারও কম। আগের তুলনায় ফলন অর্ধেক কমে গেছে। এখন এই অবস্থা হলে আগামী বছর চাষ করতে পারব কি-না, তা নিয়েই ভীষণ চিন্তায় আছি।

মং প্রু মারমা নামে আরেকজন বলেন, আমরা ধানের পাশাপাশি মারফা, তিল, হলুদ ও ভুট্টাসহ আরও কয়েক ধরণের সবজি আবাদ করে থাকি। কিন্তু সেগুলোরও ফলন এ বছর ভালো হয়নি। জুমের চাষাবাদ করে যা ফলন হয় তা দিয়ে আমরা সারা বছর খেয়ে থাকি কিন্তু ফলনের পরিমাণ আস্তে আস্তে কমে আসার  কারণেই আমরা চিন্তায় আছি। সামনে কী হবে।

বরকল উপজেলার আইমাছড়া ইউনিয়নের জুমচাষি জ্ঞান ময় চাকমা বলেন, আমি দুই আড়ি ধান রোপণ করে ১০০ আড়ি মতো ধান পাবো বলে আশা করেছি। কিন্তু জুমের ফলন ভালো না হওয়ায় ৫০ হতে ৬০ আড়ি মতো ধান পাবো বলে আশা করছি। জুমের ফলন আস্তে আস্তে কমে আসছে আগের মতো আর ফসল পাওয়া যায় না। 

003

কিরণ চাকমা নামে আরেক জন বলেন, আমাদের কিছু জুমের ধান কাটা শেষে হয়েছে, আবার কিছু অংশ এখনো কাঁচা রয়েছে। আমাদের আশেপাশে অনেকেই জুমের ধান কাটা শেষ করে ঘরে তুলেছে। তবে এবারে আমার ও আশেপাশের প্রতিবেশীদের করা জুমের ফলস ভালো হয়নি। মনে হচ্ছে এবারে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে না। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য মতে, এবছর রাঙামাটি জেলাজুড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন। এদিকে ২০২৫ সালে জেলায় ৪ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমি থেকে ফলন হয়েছে ৭ হাজার ৪৩৭ মেট্রিকটন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি জেলার উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, একটা পাহাড়ে যদি দশ থেকে পনেরো বছর বিরতি দেওয়া যায় তাহলে সেক্ষেত্রে জুমের ফলনটা ঠিক থাকে। কিন্তু এখানে দেখা যায় তিন -চার বছর পর পর জুম চাষ করা হয় একটা পাহাড়ে. আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় এক বছরও বিরতি দেওয়া হয় না। একই জমিতে ঘন ঘন জুম চাষ করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ি জমিতে পর্যাপ্ত জৈব উপাদান আগের মতো থাকছে না। যে কারণে প্রতিবছর জুমের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, এবারে রাঙামাটি জেলায় মোট পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। যার লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে আনুমানিক দশ হাজার মেট্রিক টন। তবে ফলনের হিসাব পেতে আমাদের আরও ১৫ হতে ২০ দিন সময় লাগবে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর