যশোরের তিন উপজেলায় চারটি নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর কাজ দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। নির্ধারিত উচ্চতা না মেনে সেতু নির্মাণের অভিযোগে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনেও জটিলতার সমাধান না হওয়ায় সেতুগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে নকশা সংশোধন করে সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে তিনটি প্রকল্পের আওতায় আটটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে যশোর সদরের ভৈরব নদের ওপর দায়তলা, রাজারহাট ও ছাতিয়ানতলা সেতু; শার্শার বেতনা নদীর ওপর নাভারণের ঘোড়পাড়ায় দুটি সেতু; মনিরামপুরের শ্রী নদীর ওপর মণিরামপুর-নেহালপুর সেতু এবং যশোর সদরে হরিহর ও মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর দুটি সেতু রয়েছে। ৪১ কোটি ৬৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অনুমোদন ছাড়াই নির্ধারিত মানের চেয়ে কম উচ্চতায় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় শুরু থেকেই আপত্তি জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। তবে আপত্তি উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায় এলজিইডি। পরে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের নেতারা উচ্চ আদালতে রিট করেন।

২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর আদালত তিন মাসের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর নীতিমালা অনুসরণ করে সেতুগুলোর কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৮ মে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই বছরের ১১ জুন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর প্রতিনিধি, যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালতে হাজির হয়ে ছয় মাসের মধ্যে নীতিমালা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির পরও দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো সংশোধিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত মান অনুযায়ী, নদীর সর্বোচ্চ পানির স্তর থেকে সেতুর গার্ডারের নিচ পর্যন্ত উচ্চতা ১৫ থেকে ১৬ ফুট রাখার বিধান রয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে এ উচ্চতা ২৫ ফুট পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। অথচ নির্মাণাধীন সেতুগুলোর উচ্চতা রাখা হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫৯ থেকে ১১ দশমিক ৫০ ফুট। এতে নৌযান চলাচল ও নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাজ বন্ধ হওয়ার আগে সেতুগুলোর অধিকাংশের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। একটি সেতুর কাজ প্রায় শেষ হয়েছিল। অন্য সাতটির মধ্যে পাঁচটির অগ্রগতি ছিল ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বাকি দুটির কাজ শেষ হয়েছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৩২ শতাংশ।
সেতুগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যশোর সদরের গোয়ালদহ এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, হরিহর নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছে। বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে।
বাঘারপাড়ার ছাতিয়ানতলা এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও ছাতিয়ানতলা হাট-ঘোপ এলাকায় ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন সংযোগ সেতুর কাজ শেষ হয়নি। ফলে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে মানুষকে।
সদরের দায়তলা সেতু এলাকার বাসিন্দা শামসুর রহমান বলেন, সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় কোনো যানবাহন এ পথে চলাচল করতে পারে না। সেতুর এক পাশে নেমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী পার হয়ে অন্য পাশ থেকে গাড়িতে উঠতে হয়। কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, নদীকে সচল ও প্রবহমান রাখার লক্ষ্যেই তাদের আন্দোলন। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সেতু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য বড় বাধা। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুত সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, সেতুগুলোর নকশা সংশোধনের জন্য এলজিইডির ডিজাইন ইউনিটের প্রকৌশলীরা গত ২৯ অক্টোবর সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। তারা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। নতুন নকশা অনুযায়ী বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।
তিনি বলেন, সেতুগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। ক্রেনের সাহায্যে গার্ডার খুলে পিলারের উচ্চতা বাড়ানো হবে। এরপর আবার পাটাতন বসানো হবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে।
প্রতিনিধি/এসএস




