গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের পর ৯৫ বছর বয়সী হাজী শামসুল হক মোল্লাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেছেন তার বড় ছেলে আজিজুল হক মোল্লা। উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে বাবাকে বাড়িতে তুলে নেন তিনি। একই সঙ্গে বাবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ভরণ-পোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আজিজুল।
এর আগে, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুই ছেলের বাড়িতে আশ্রয় না পেয়ে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে দিন কাটাতে হয় শামসুল হককে। দুই ছেলে ও চার মেয়ে থাকলেও কেউ তার দায়িত্ব নিতে রাজি না হওয়ায় ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
বিষয়টি জানার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন শামসুল হকের দুই ছেলে ও চার মেয়েকে তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। সেখানে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে বাবার ভরণ-পোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। পরে বড় ছেলে আজিজুল হক মোল্লা বাবার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

শামসুল হক মোল্লা উপজেলার উত্তর হিরণ গ্রামের ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে। তার দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল পেশায় ফেরিওয়ালা। ছোট ছেলে রেয়াজুল বাসের চালকের সহকারী। চার মেয়ের মধ্যে মায়া, সাবিনা ও সালমা বিবাহিত। ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে জমিজমা বিক্রি করে হজ পালন করেন শামসুল হক। এ সময় অবশিষ্ট জমিজমাও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। তবে সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়ার পর থেকে সন্তানদের অনেকেই তার খোঁজখবর ও দেখাশোনায় আগ্রহ দেখাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত কয়েক দিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন শামসুল হক। মঙ্গলবার সকালে মায়া তাকে দুই ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে যান। অভিযোগ, এ সময় দুই ভাই ও তাদের স্ত্রীরা মিলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিতে হয় তাকে।
বড় মেয়ে মায়া বেগম বলেন, তার স্বামী অসুস্থ। এ ছাড়া বাড়িতে শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলী থাকেন। এ অবস্থায় বাবাকে নিজের কাছে রেখে দেখাশোনা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
মেজ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, বাবা জমি বিক্রি করে চার বোনকে চার লাখ টাকা করে দিয়েছেন। অন্যদিকে দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দিয়েছেন। এখন বোনেরা কেন বাবার দেখাশোনা করবেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আজিজুল হক মোল্লা বলেন, ‘ইউএনও স্যার বলার পর আমি আমার বাবাকে ঘরে নিয়েছি। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার বাবা আমার কাছেই থাকবেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, ‘বৃদ্ধ শামসুল হক মোল্লার বিষয়টি জানার পর আমরা তার সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং সবাইকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠাই। সেখানে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাবার ভরণ-পোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরে তার বড় ছেলে বাবার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন এবং তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। একজন বৃদ্ধ বাবার শেষ বয়সে যেন অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না হয়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ভবিষ্যতেও বিষয়টির খোঁজখবর রাখা হবে।’
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আপাতত আশ্রয় মিলেছে ৯৫ বছর বয়সী শামসুল হকের। তবে বড় ছেলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তার ভরণ-পোষণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
প্রতিনিধি/এসএস




