বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জেলা প্রতিনিধি, যশোর
প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

শেয়ার করুন:

তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের রূপকার, বরেণ্য রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার প্রয়াণে শুধু বিএনপির রাজনীতিতেই নয়, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সৃষ্টি হয়েছিল গভীর শূন্যতা। আট বছর পেরিয়ে গেলেও যশোরের মাটি ও মানুষের স্মৃতিতে তিনি আজও অমলিন।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংগঠক ও পুরোধা ছিলেন তরিকুল ইসলাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি যশোর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। রাজনীতি তার কাছে কেবল ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবির বিষয় ছিল না; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো, জনপদের সমস্যা তুলে ধরা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করাই ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। তার বাবা আব্দুল আজিজ ছিলেন ব্যবসায়ী। মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী।

১৯৬১ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬৩ সালে যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে আইএ পাস করেন তিনি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৯ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন থেকেই তার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল থাকায় আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৬৬ সালে রাজনৈতিক মামলায় বেশ কিছুদিন কারাভোগ করেন। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে রাজবন্দি হিসেবে যশোর ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে টানা নয় মাস আটক ছিলেন। কারাবাস কিংবা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং এসব অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনকে আরও দৃঢ় ও পরিণত করে।

Tariqul

১৯৭০ সালে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন তরিকুল ইসলাম। মওলানা ভাসানীর আহ্বানে ফারাক্কা লংমার্চেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে আবারও তিন মাস কারাভোগ করেন। ১৯৭৮ সালে যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনায় তার নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এ সময় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির ৭৬ সদস্যের অন্যতম ছিলেন তিনি। যশোর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তরিকুল ইসলাম পর্যায়ক্রমে সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের জন্মভূমি যশোর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নেও বিশেষ মনোযোগী ছিলেন তিনি। এ অঞ্চলের যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে তার উদ্যোগ ও ভূমিকা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়। স্পষ্টভাষী, দৃঢ়চেতা ও জনদরদি রাজনীতিক হিসেবে তিনি অর্জন করেছিলেন ব্যাপক পরিচিতি। আমৃত্যু বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।

রাজনীতির বাইরেও তরিকুল ইসলামের ছিল বহুমাত্রিক পরিচয়। পাঠকপ্রিয় দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক হিসেবে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের জগতেও তার অবদান রয়েছে।

তার পারিবারিক জীবনেও রয়েছে শিক্ষা ও রাজনীতির নিবিড় সংযোগ। তার সহধর্মিণী অধ্যাপক নার্গিস বেগম যশোরের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। বড় ছেলে শান্তনু ইসলাম সুমিত দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও বহন করছেন পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। একই সঙ্গে যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

তরিকুল ইসলামের পরিচয় কেবল দলীয় পদ-পদবি কিংবা মন্ত্রিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন এবং নিজ জনপদের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে যশোরের ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে। তার রাজনৈতিক পথচলায় যেমন ছিল আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, তেমনি ছিল মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং নিজ জনপদের উন্নয়নের প্রতি গভীর অঙ্গীকার। তাই মৃত্যুর আট বছর পরও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে তিনি আজও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয়।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর