সীমিত সামর্থ্যের কৃষক বাবার ঘামঝরা পরিশ্রম, মায়ের অনুপ্রেরণা আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে নানা প্রতিকূলতা ও অসুস্থতাকে জয় করে সাফল্য অর্জন করেছেন মোসা. সাওদা মণি (১৮)। বাবার কষ্টের মর্যাদা রেখে বরগুনা সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পরিবার ও এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি। তার এই অর্জনে আনন্দিত স্বজন ও এলাকাবাসী।
সাওদা মণির বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ-পূর্ব কেওড়াবুনিয়া গ্রামে, আয়লা-পাতাকাটা ইউনিয়নে। তিনি ইটবাড়িয়া কদমতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বরগুনা সরকারি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন সাওদা। এসএসসি পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল তাকে। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় ভালো ফল করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হয়নি। সেই আক্ষেপ থেকেই এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেন।

পড়াশোনার খরচ ও যাতায়াতের ব্যয় সামলাতে কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছেন তিনি। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। তার এই অধ্যবসায়ের ফল এসেছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়। তার পরবর্তী লক্ষ্য ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা।
বরগুনা সরকারি কলেজের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজ থেকে মোট ৮২৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৪৮৬ জন। কলেজটিতে মোট ৩৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ১৫ জন, মানবিক বিভাগে ১৭ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে একজন।
দাদা আবদুল খালেক হাওলাদার বলেন, নিজের সন্তানদের দিয়ে যে স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, নাতনির সাফল্যের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেখছি। তার ফলাফলে আমি গর্বিত ও আনন্দিত।

এলাকাবাসী মো. শাহীন আলম বলেন, সাওদার এই অর্জনে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো গ্রামের মানুষ আনন্দিত। প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালো ফল করায় সে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
সাওদার মা মোসা. লাইজু আক্তার বলেন, এসএসসি পরীক্ষার সময় মেয়ের অসুস্থতার কারণে প্রত্যাশিত ফল হয়নি। সেই কষ্ট মনে রেখেও মেয়েকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ায় তিনি ভীষণ আনন্দিত। মেয়ের স্বপ্ন ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
বাবা আবদুল কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, মানুষের জমিতে কৃষিকাজ করে পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করেছেন।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মেয়েকে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন।
সাওদা মণি বলেন, আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মায়ের। বাবা অনেক কষ্ট করে মানুষের জমিতে কৃষিকাজ করে আমার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। তাদের পরিশ্রমকে সার্থক করতেই ভালো ফলাফলের জন্য চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। সবার দোয়া ও সহযোগিতা পেলে স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।

তিনি আরো বলেন, মেয়ের এই ফলাফলে বাবা হিসেবে আমি গর্বিত। সবার দোয়া, ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেলে সাওদাকে আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব।
বরগুনা সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. ছগীর হোসেন বলেন, সাওদা মণির এই ফলাফলে কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আনন্দিত। নিয়মিত পড়াশোনা, অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ফলেই সে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছে। ভবিষ্যতেও উচ্চশিক্ষার পথে সাওদার পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
প্রতিনিধি/এসএস




