যশোরের কেশবপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার মাছের বাণিজ্য হচ্ছে। দৈনিক প্রায় ৩৩৩ মেট্রিক টন মাছের বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য বাণিজ্যকেন্দ্র। এ বাজার থেকে দেশের প্রায় ২৫টি জেলায় মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি ভারতের সঙ্গেও ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে চলছে মাছের বাণিজ্য। বাজারটিকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের।
বিপুল এই বাণিজ্যের মধ্যেও নানা অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সংকটে ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে। বিশেষ করে আড়তের আশপাশের বেহাল রাস্তাঘাট, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ডিজিটাল ওজনব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মৎস্য বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়বে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেশবপুর উপজেলায় মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৩৭ হাজার ৬৩১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা ৭ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন পূরণের পর প্রায় ৩০ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন মাছ বিভিন্ন জেলা ও দেশের বাইরে সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে মৎস্য খাত।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কেশবপুর মাছ বাজারে রয়েছে ২৭টি আড়ত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ জন অংশীদার ব্যবসা পরিচালনা করছেন। প্রতিদিন মাছ পরিবহনে যুক্ত থাকে প্রায় ১৫টি ট্রাক। বাজারে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, মৃগেল, রুই, ব্ল্যাক কার্প ও গ্রাস কার্প। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ সরবরাহের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের মাছের মেলাতেও অংশ নেন কেশবপুরের ব্যবসায়ীরা।
এ বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবিকা। মাছ ওঠানো-নামানো, ঝুড়ি বহন, বরফ দেওয়া ও পরিবহনের কাজে প্রতিদিন ব্যস্ত সময় পার করেন শ্রমিকেরা। তাঁদের শ্রমেই সচল রয়েছে এই বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র। তবে কাজের পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব তাঁদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
শ্রমিক আলআমিন ও ইমরান জানান, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে আড়তের আশপাশের রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। এতে মাছ ওঠানো-নামানো ও পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টির সময় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া বাজারে বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাঁদের ট্যাংকির পানি পান করতে হয়। দ্রুত রাস্তাঘাট সংস্কার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তাঁরা।
কেশবপুর মাছ বাজারের সেক্রেটারি আব্দুল হান্নান বিশ্বাস বলেন, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ কেনাবেচা ও সরবরাহের কারণে বাজারটির গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। অথচ এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বাজারের রাস্তাঘাট সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি ডিজিটাল ওজনব্যবস্থা চালু করা গেলে বেচাকেনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। এতে মাছচাষি, ক্রেতা, বিক্রেতা ও শ্রমিক—সবাই উপকৃত হবেন।
ঘেরমালিক কিরামত গাজী বলেন, মৎস্য খাত কেশবপুরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানকার উৎপাদিত মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। মাছ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আরও উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এ খাতের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়বে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস বলেন, কেশবপুরের অর্থনীতি অনেকাংশেই মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। মাছের বাজার ও আড়তগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
/এএস




