‘বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র হলেও কার্যত এখনো এর প্রত্যেকটি ব্যবস্থা ও সিস্টেম দিল্লির প্রেসক্রিপশনে চলে’- এমন মন্তব্য করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, দিল্লির আধিপত্যবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করা না গেলে রক্তের বিনিময়েও বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
রোববার বিকেলে (১ নভেম্বর) ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত অবস্থান ও সাংস্কৃতিক আড্ডায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচারসহ তিন দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাজনৈতিক পুনর্বাসন, সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আবদুল্লাহ আল জাবের।
শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, শ্রমিকেরা তাদের উপার্জন দিয়ে বাড়িভাড়া পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতে পারছেন না। তারা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন, যাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।
কিন্তু তাদের দাবির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে পুলিশ লাঠিপেটা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আন্দোলনস্থলে ছাত্রলীগের উপস্থিতির অজুহাত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতা।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও ছাত্রলীগের কার্যক্রম কীভাবে চলছে, তা জানতে চান তারা। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের ঘটনা ঘটলেও সেসবের বিচার হচ্ছে না। অথচ শ্রমিকদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখানো হচ্ছে।
ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপসহীন থাকার আহ্বান জানিয়ে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, কোনো ব্যক্তি যে কারণেই হোক জুলুমের শিকার হলে সেটি জুলুমই; তা কখনো ইনসাফ হতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থা এমনভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে- অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না।
সংবিধান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জুলাই সনদের বৈধতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, সংবিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি দাবি করেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে এক পক্ষের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে একই যুক্তিতে অন্য পক্ষের অবস্থানও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের সেই অভ্যুত্থানের অবদান অস্বীকার না করার আহ্বানও জানান তিনি।
রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারবঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য পাওনা ও বিচার চাইলে তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে চান। কিন্তু সেই দাবির জবাবে নির্যাতন চালানো হলে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
বক্তব্যে সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর কারাবন্দি থাকার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। পাশাপাশি গত ৫৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের প্রত্যাশিত পরিবর্তন না হওয়ার জন্য তথাকথিত সুশীল সমাজের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ তিন দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি চলছে।
আয়োজকেরা আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়ে তারা বলেছেন, পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ।
ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত কর্মসূচিতে ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া স্থানীয় কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিনিধি/এলএ




