রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রেম-মৃত্যুর গল্প, নেত্রকোনায় চিরনিদ্রায় ৩ অস্ট্রেলীয়

জেলা প্রতিনিধি,  নেত্রকোনা 
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রেম-মৃত্যুর গল্প, নেত্রকোনায় চিরনিদ্রায় ৩ অস্ট্রেলীয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক সিরিল জেমস মূর ও এডনা। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেই তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ভালোবাসার সম্পর্ক। সেই ভালোবাসাকে পরিণয়ে রূপ দিতে তারা বেছে নিয়েছিলেন নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের একটি চার্চকে। 

কিন্তু বিয়ের সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর আগেই নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান তারা দুজন এবং তাদের সঙ্গে থাকা অস্ট্রেলীয় সেনা কর্মকর্তা রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটার।

ঘটনাটি ১৯৪৪ সালের ২৯ জুলাইয়ের। প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেলেও মদনের গোবিন্দশ্রী ও পরে মোহনগঞ্জের কুলপতাক গ্রামের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে ঘটনাটি আজও স্মৃতিবেদনার এক অনন্য অধ্যায়।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে মূর ও এডনা সিদ্ধান্ত নেন, তারা ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে করবেন। এ জন্য তারা নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের ব্যাপ্টিস্ট চার্চকে বিয়ের স্থান হিসেবে বেছে নেন।

১৯৪৪ সালের ২৮ জুলাই তারা ময়মনসিংহ থেকে গোবিন্দশ্রীর উদ্দেশে রওনা হন। তাদের সঙ্গে ছিলেন মূরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটার। পটার ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান আর্মির একজন কর্মকর্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর হয়ে এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। বন্ধুর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে যুদ্ধের দায়িত্বের মধ্যেই তাদের সঙ্গে যাত্রা করেছিলেন পটার।

প্রথমে ট্রেনে করে ময়মনসিংহ থেকে তারা পৌঁছান নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ময়মনসিংহ থেকে আরও কয়েকজনও তাদের সঙ্গে আসেন। মোহনগঞ্জ থেকে নৌকায় করে শুরু হয় গোবিন্দশ্রীর পথে যাত্রা।

নৌযাত্রার পথটিও ছিল দীর্ঘ ও দুর্গম। শাপমারা খাল দিয়ে ডিঙ্গাপোতা হাওর পেরিয়ে তারা ছেছরাখালী (বর্তমানে আদর্শনগর) বাজারের খাল হয়ে ধলাই নদীতে ওঠেন। এরপর বাওয়াইচের হাওর পেরিয়ে গোবিন্দশ্রী গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় হঠাৎ তাদের নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে।

প্রচণ্ড ঝড়ে নৌকাটি উল্টে যায়। পানিতে পড়ে যান মূর, এডনা ও পটারসহ নৌকায় থাকা যাত্রীরা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তিন অস্ট্রেলিয়ান সাঁতার জানতেন না। সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে নৌকাডুবির খবর পেয়ে গোবিন্দশ্রী গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি, তিনজনেরই মৃত্যু হয়।

বিয়ের পোশাক ও আনন্দের প্রস্তুতি নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয় শোকের মিছিলে। গোবিন্দশ্রী গ্রামের মানুষ তখন তিন বিদেশির মরদেহ উদ্ধার করে সেখানেই সমাহিত করেন। 

বিয়ের বদলে তিন সমাধি 

যে চার্চে মূর ও এডনার বিয়ের ঘণ্টা বাজানোর কথা ছিল, সেখানে শেষ পর্যন্ত বাজেনি বিয়ের ঘণ্টা। বর-কনে ও তাদের বন্ধুর জন্য তৈরি হয় তিনটি সমাধি।

গোবিন্দশ্রীতে তাদের সমাধি দীর্ঘদিন স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের স্মৃতির অংশ হয়ে ছিল। পরে ১৯৫৮ সালে গোবিন্দশ্রী ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সদস্যরা মোহনগঞ্জ উপজেলার কুলপতাক গ্রামে চলে আসেন। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। অস্ট্রেলীয় তিন নাগরিকের সমাধির স্মৃতিও পরবর্তীকালে কুলপতাকে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানে তাদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই তিনটি সমাধি হয়ে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। 

সমাধি খুঁজতে এসে জানা গেল পটারের পরিচয়

বহু বছর পর ওই সমাধিগুলোর খোঁজে ওয়ার সিমেট্রির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এলাকায় আসেন। তখনই রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটারের পরিচয় নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। জানা যায়, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়ান আর্মির একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং মিত্রবাহিনীর হয়ে এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বন্ধুর বিয়েতে যোগ দিতে যুদ্ধের দায়িত্বের মধ্য থেকে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন পটার, সেই যাত্রাই তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে যায়। 

আট দশক পরও স্মৃতির কাছে বিদেশিরা 

গোবিন্দশ্রী ও কুলপতাকের এই সমাধিগুলো শুধু তিন বিদেশির কবর নয়; স্থানীয় মানুষের কাছে এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এক অজানা মানবিক গল্পের স্মারক। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, যুদ্ধ আর মৃত্যুর এক করুণ অধ্যায় যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।

এই সমাধিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান ও ব্রিটিশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিরা এসেছেন বলে স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্যরা জানান।

আজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময় নেই, নেই মূর-এডনা কিংবা পটারও। কিন্তু নেত্রকোনার হাওর-বেষ্টিত জনপদে এখনো টিকে আছে তাঁদের স্মৃতি।

একটি বিয়ের জন্য যাত্রা করেছিলেন তারা। গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। চার্চে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিয়ের আয়োজন, কিন্তু হাওরের পানিতে থেমে যায় সেই স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত গোবিন্দশ্রীর মাটিই হয়ে ওঠে তাদের শেষ ঠিকানা।

মোহনগঞ্জের কুলপাতক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে সিরিল জেমস মূর, এডনা ও রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটারের সেই স্মৃতিময় অধ্যায়।

গত শুক্রবার কুলপাতক ব্যাপ্টিস্ট চার্চে গিয়ে দেখা গেছে, চার্চের আঙ্গিনায় পাশাপাশি ওই তিনজনের সমাধি রয়েছে। একই সমাধিতে সমাহিত করা হয়েছে জেমস মূর ও এডনাকে। পাশে আলাদা সমাধিতে রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটার। সমাধি ফলকে জেমস মূর ও এডনাকে পতী-পতœী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।  

কুলপাতক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সহকারী পালক ডেভিড দাস বলেন, এই ব্যাপ্টিস্ট চার্চটি একসময় পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলায় ছিল। ওই সময় চার্চে অনেক অস্ট্রেলিয়ান থাকতেন। সেই সূত্রেই জেমস মূর ও এডনা বিয়ের জন্য ওই চার্চকে বেচে নেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তাদের বন্ধু আরেক সেনা কর্মকর্তা রন্যাল্ড চেষ্টারটন পটারকে, যিনি সেসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করছিলেন। 

ঝড়ের রাতে নৌকায় করে হাওর পেরিয়ে চার্চে যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে তারা তিনজনই মারা যায়। তারা সাঁতার জানতেন না। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করে চার্চের পাশেই সমাহিত করা হয়। একপর্যায়ে চার্চ মোহনগঞ্জের কুলপতাকে স্থানান্তরিত হলে তাদের সমাধিও এখানে নিয়ে আসা হয়। এখানে চার্চের আঙ্গিনায় তাদের সমাহিত করা হয়েছে। 

প্রতিবছরই তাদের সমাধি দেখতে ও শ্রদ্ধা জানতে অবস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটিশ অ্যম্বেসির লোকজন আসেন। নিহতদের বিষয়ে সকল তথ্য চার্চের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যেন মানুষ এ বিষয়ে জানতে পারে। তাদের সমাধি প্রেম ও বন্ধুত্বের বার্তা দেয়।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর