রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সুন্দরবনে বনদস্যুদের তাণ্ডব, জাল পুড়িয়ে জেলেদের প্রতিবাদ

জেলা প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

সুন্দরবনে বনদস্যুদের তাণ্ডব, জাল পুড়িয়ে জেলেদের প্রতিবাদ
জাল পুড়িয়ে জেলের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন। ছবি: ঢাকা মেইল

সুন্দরবনে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অপহৃত জেলে-বাওয়ালিদের উদ্ধার এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছেন উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা ও বনজীবীরা। কর্মসূচির শেষ দিনে মাছ ধরার জাল পুড়িয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। একই সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।

রোববার (১ নভেম্বর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনগর বাজারে এবং বেলা ১১টার দিকে উপজেলা সদরে গাবুরা ইউনিয়নের উদ্যোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। 

এতে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে স্মারকলিপি দেন তারা।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণে যেতে হলে বিভিন্ন বনদস্যু বাহিনীকে টাকা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো বাহিনী নৌকাপ্রতি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বা তার বেশি দাবি করছে। টাকা দেওয়ার পর জেলেদের হাতে নির্দিষ্ট নম্বর লেখা কাগজ বা নোট দেওয়া হয়, যা দেখিয়ে বনে প্রবেশ করতে হয়। টাকা দিতে না চাইলে মারধর, নির্যাতন ও অপহরণের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।

জেলেরা জানান, একাধিক বাহিনীকে টাকা দিতে গিয়ে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের আয় থেকে বড় অংশ চলে যাচ্ছে। এতে ঋণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে অনেককে। সামনে শুঁটকি মাছের মৌসুম হলেও বনদস্যুদের ভয়ে অনেকে বনে যেতে পারছেন না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

এক জেলে বলেন, বনে যাওয়ার আগে স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে বনদস্যুদের টাকা দিতে হয়। এক লাখ টাকা দেওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট নম্বর লেখা নোট দেওয়া হয়। সেটি ছাড়া বনে গেলে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। 

তার ভাষ্য, বিভিন্ন বাহিনীকে টাকা দিতে গিয়ে জেলেদের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরেক জেলে বলেন, আগে একটি বাহিনীকে টাকা দিলেই চলত, এখন একাধিক বাহিনীকে টাকা দিতে হচ্ছে। কেউ ৭০ হাজার, কেউ ৮০ হাজার, আবার কেউ এক লাখ টাকার বেশি দাবি করছে। এভাবে টাকা দিয়ে বনে মাছ ধরতে গেলে তাদের হাতে তেমন কিছুই থাকে না।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ও আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সালাউদ্দিন লিটন বলেন, বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে তারা পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। রোববার ছিল কর্মসূচির শেষ দিন। এদিন ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল সোমবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এরপর বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে দাবি জানানো হবে।

তিনি আরও বলেন, কোস্টগার্ড, বন বিভাগ, নৌ পুলিশ, এসআরবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো হলে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আগামী সাত দিনের মধ্যে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন এবং কার্যালয় অবরোধের ঘোষণা দেন তিনি।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক বলেন, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও থানা-পুলিশের প্রতিনিধিদের নিয়ে সুন্দরবনের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। অতীতেও অভিযানে বনদস্যু গ্রেফতারের তথ্য রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দেওয়া স্মারকলিপি গুরুত্বসহ বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাফিউল্লাহ পাটোয়ারী বলেন, বনদস্যুদের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে। নির্দিষ্টভাবে কারও বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুন্দরবনে জেলে ও বনজীবীরা যাতে নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সে জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর