পাওনা ১ হাজার ২৬৩ টাকা চাওয়ায় চা দোকানিকে হত্যা, চাঁদাবাজি করতে গিয়ে কলেজছাত্রকে খুন, পারিবারিক বিরোধে নারী হত্যা এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের শিশুসন্তানকে হত্যা—মৌলভীবাজারে পৃথক এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত দুই মাসে চারটি মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। এসব রায়ে ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১৭ আসামি খালাস পেয়েছেন। অন্য দুই আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার শ্রীমঙ্গলে শাবানা বেগম হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর আগে গত ১২ অক্টোবর চা দোকানি দুরুদ মিয়া হত্যা মামলায় একজন, ৩০ সেপ্টেম্বর কলেজছাত্র রেজাউল করিম নাঈম হত্যা মামলায় চারজন এবং ২৪ আগস্ট কমলগঞ্জে সাড়ে তিন বছরের শিশু রুনা বেগম হত্যা মামলায় তার বাবা শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
চারটি মামলার ঘটনাস্থল, হত্যার কারণ ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কোনোটি সামান্য পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ, কোনোটি চাঁদাবাজি, আবার কোনোটি পারিবারিক বিরোধ কিংবা প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা থেকে সংঘটিত হয়েছে। এসব মামলার রায়কে ঘিরে জেলার বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতি ও হত্যাকাণ্ডগুলোর ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার শ্রীমঙ্গলে শাবানা বেগম হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অন্য দুই আসামিকে যথাক্রমে সাত বছর ও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আনোয়ারুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নাসির মিয়া, গিয়াস মিয়া, বিল্লাল মিয়া ও দুলাল মিয়া। তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার অন্য দুই আসামি মহিবুর রহমান ওরফে অমৃত মিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। জয়নাল আবেদীনকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল শ্রীমঙ্গল উপজেলার পূর্ব লইয়ারকুল গ্রামে বাড়ির পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিরোধের জেরে সৎভাই ও তার স্বজনরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে শাবানা বেগমকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই হেলাল মিয়া ১৪ জনকে আসামি করে শ্রীমঙ্গল থানায় মামলা করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
এদিকে, গত ১২ অক্টোবর মাত্র ১ হাজার ২৬৩ টাকা পাওনা চাওয়ায় দুরুদ মিয়া নামে এক চা বিক্রেতাকে কুপিয়ে হত্যার দায়ে প্রধান আসামি ছাদিক মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলার অপর সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক শামসাদ বেগম এ রায় দেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০০৮ সালের ১২ জুন সকালে সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের নারাইনপাশা এলাকার চা দোকানি দুরুদ মিয়া তার পাওনা ১ হাজার ২৬৩ টাকা ছাদিক মিয়ার কাছে চান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ছাদিক মিয়া সেখান থেকে চলে যান। কিছুক্ষণ পর দলবল নিয়ে ফিরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে দুরুদ মিয়াকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে গুরুতর আহত করেন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ওই দিন রাত সাড়ে ১১টায় নিহতের ছেলে মকবুল মিয়া বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখ করে মৌলভীবাজার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
এ ছাড়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর কলেজছাত্র রেজাউল করিম নাঈম হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অপর পাঁচ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রবিউল আউয়াল এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. নুরুল ইসলাম, মো. সাইমন ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম রনি ও আনোয়ার হোসেন। তাঁদের মধ্যে রনি ও আনোয়ার পলাতক রয়েছেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় সদর উপজেলার বর্ষিজোড়া এলাকার চেরাগ মিয়ার বাড়িতে চাঁদা আদায়ের জন্য নুরুল ইসলামসহ কয়েকজন আসামি প্রবেশ করেন। এ সময় তারা চেরাগ মিয়া ও তার স্ত্রী শামসুন নাহারকে গালাগাল ও মারধর করেন। বাবা-মাকে মারধর থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে আসামিরা নাঈমকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার দুই দিন পর, ৯ নভেম্বর নাঈমের বাবা চেরাগ মিয়া বাদী হয়ে থানায় নয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর পাঁচ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, গত ২৪ আগস্ট কমলগঞ্জে প্রতিপক্ষ চাচাতো ভাইকে ফাঁসাতে নিজের সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যা রুনা বেগমকে পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যার মামলায় বাবা শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মো. আনোয়ারুল হক এ রায় দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কমলগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ভানুবিল গ্রামের শরীফ আলী তার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাই সালেক মিয়াকে ফাঁসাতে মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় নিজের সাড়ে তিন বছরের মেয়ে রুনা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করেন। এ ঘটনায় শিশুটির মা নেকজান বিবি কমলগঞ্জ থানায় তার স্বামীকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে শরীফ আলী আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
আদালতের এসব রায় প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট নিয়ামুল হক বলেন, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার মাধ্যমে আদালতে মামলাজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে। দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ায় সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা উপকৃত হচ্ছেন। ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের এ গতিশীলতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এসব দণ্ডের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস




