রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে মুন্নার জিপিএ-৫, স্বপ্ন এখন বিশ্ববিদ্যালয়

ইউসুফ দেওয়ান রাজু, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম

শেয়ার করুন:

দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে মুন্নার জিপিএ-৫, স্বপ্ন এখন বিশ্ববিদ্যালয়
এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করা মো. মোন্নাফ হোসেন মুন্না বাবা-মায়ের সঙ্গে।

অভাব যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে স্বপ্ন দেখাটাই যেন বিলাসিতা। কিন্তু সেই অভাবকে জয় করেই সাফল্যের আলো জ্বালিয়েছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার এক নির্মাণশ্রমিকের ছেলে মো. মোন্নাফ হোসেন মুন্না।

মুন্নার বাবা ইমারত নির্মাণশ্রমিক, মা স্থানীয় একটি এনজিও অফিসের আয়া। কোনো দিন কাজ থাকে, আবার কোনো দিন কাজ মেলে না। অভাব-অনটনের এমন সংসারেও থেমে থাকেনি মুন্নার পড়াশোনা। বাবা-মায়ের পরিশ্রম আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি।

মুন্না সরকারি বেগম নুরুন্নাহার তর্কবাগীশ অনার্স কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে ধানঘরা মডেল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।

3f30d548-474e-4f27-ae47-a9c2d18f9fa6

মুন্নার বাবা রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন দিনমজুর ও ইমারত নির্মাণশ্রমিক। মা মোছা. মিরা খাতুন স্থানীয় একটি এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করেন। মাস শেষে তার বেতন মাত্র ৬ হাজার টাকা। সেই সামান্য আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ, সংসার চালানো এবং ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারটিকে।

অর্থের অভাবে কোনো কোচিং সেন্টার কিংবা ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ হয়নি মুন্নার। স্কুল-কলেজের ক্লাস আর নিজের অধ্যবসায়ই ছিল তার ভরসা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। সেই প্রচেষ্টার ফল মিলেছে পরপর দুটি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মধ্য দিয়ে।

মায়ের চোখে স্বপ্ন, বাবার মুখে হাসি ছেলের সাফল্যে আনন্দে চোখে জল এসেছে মা মিরা খাতুনের।

তিনি বলেন, ‘ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করব—এটাই আমার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। এনজিওতে আয়ার কাজ করে ৬ হাজার টাকা বেতন পাই। সংসারে অভাব-অনটন, ঋণ আছে। তারপরও নিজের শাড়ি না কিনে, নিজে না খেয়ে ছেলের জন্য বই কিনেছি। আজ মনে হচ্ছে আমার সব কষ্ট সার্থক।’

বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইট-বালুর কাজ সব সময় থাকে না। কোনো দিন কাজ পাই, কোনো দিন খালি হাতে বাড়ি ফিরি। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি। ও যখন জিপিএ-৫ পেল, মনে হলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলা সার্থক হয়েছে।’

hsc

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন মুন্নার নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব বাবা-মাকেই দিয়েছেন মুন্না।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়িয়েছেন। তাদের কষ্ট আমি নিজের চোখে দেখেছি। কোনো কোচিং করতে পারিনি, তবুও হাল ছাড়িনি। এখন আমার একটাই স্বপ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া। প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, তাঁদের কষ্টের দিন শেষ করতে চাই।’

ধানঘরা থেকে রায়গঞ্জ—অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মুন্নার এই সাফল্য শুধু একটি ফলাফল নয়; এটি একটি পরিবারের নিরন্তর সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নের গল্প। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুন্না।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর