শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত সুবর্ণচরে

মাহবুবুর রহমান
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত সুবর্ণচরে

ফেলে দেওয়া কলাগাছ ও কচুরিপানা দিয়ে পরিবেশবান্ধব সুতা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক বেকার যুবক। উপকূলীয় এলাকার চর আমানুল্লাহ ইউনিয়নের এক নির্জন চরে গড়ে ওঠা এই সম্ভাবনাময় সুতা এখন রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

বহুল প্রচলিত খনার বচনে বলা হয়েছে ‘কলা রুয়ে না কেট পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’। এই বচনটি যেন এখন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বেকার যুবক শংকর মজুমদার ইউটিউব দেখে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি মেশিন কিনে এই অভিনব উদ্যোগ নেন। অব্যবহৃত কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির এই কর্মযজ্ঞে বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। মাসে আয় করছেন কয়েক লাখ টাকা।

শংকর মজুমদার বলেন, এখানে উৎপাদিত কলা গাছের সুতা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে যোগাযোগ করে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন করে সুতা চাওয়া হচ্ছে তবে পর্যাপ্ত পুঁজি ও মেশিনের স্বল্পতার কারণে সেই চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

Spining

শ্রমিক মিঠুন বলেন, আমরা প্রথমে কলাগাছ সংরক্ষণ করি পরে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি করা হয়। সুতা তৈরি করার পর ওয়াশ করা হয়, ওয়াশ করার পর এগুলাকে রোদে দেওয়া হয়। রোদ দেওয়া হয়ে গেলে এগুলাকে প্যাকেটিং করা হয়।

উদ্যোক্তার সহকর্মীরা জানান, প্রথমে কলাগাছ ও কচুরিপানা সংগ্রহ করে তা থেকে কাঁচামাল তৈরি করা হয়। এরপর মেশিনের মাধ্যমে সুতা বের করে তা ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকানোর পর তা সঠিকভাবে প্যাকেটিং করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

বাজারদর ও ব্যবহার

বর্তমানে এখানকার কলাগাছের সুতা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং কচুরিপানার সুতা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কলাগাছের সুতা চীন এবং কচুরিপানার সুতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। এ ছাড়া সুতা তৈরির পর অবশিষ্ট বর্জ্য বা ওয়েস্টেড অংশগুলোও ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। এসব বর্জ্য প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা নার্সারিতে কোকোডাস্ট তৈরিসহ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

এক সময়ে যেসব কাঁচামাল বা গাছ কেটে ফেলে দেওয়া হতো, তা দিয়ে যে মূল্যবান সুতা তৈরি করে অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব তা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু শংকরের এই সফলতায় এলাকার যুবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই কারখানা দেখতে আসছেন এবং অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

Spining1

তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর পরিধি আরও বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পর্যাপ্ত পুঁজি অত্যন্ত জরুরি। বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পেছনের উদ্যোক্তাদের পাশে সরকার দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। 

এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খুরশীদ আলম বলেন, শংকর নামে একজন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে কলাগাছ এবং কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবে নোয়াখালী, বগুড়া এবং দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সেগুলো বাজারজাত করছে। যুব উন্নয়ন অধিদফতর এ ধরনের উদ্যমী যুবকদের পাশে সবসময় আছে এবং থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আমি আশা করব যে শংকর মজুমদার যেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ ব্যাংক এবং আমাদের যে কর্মসংস্থান ব্যাংক আছে এগুলো থেকে কীভাবে তাকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া যায় সেই ব্যাপারে ইতোমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকিব ওসমান বলেন, চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের একজন তরুণ উদ্যোক্তা, আমাদের পরিবেশে প্রাপ্ত খুবই একটি সহজলভ্য উপাদান কচুরিপানা এবং কলাগাছ থেকে সুতা তৈরির প্রযুক্তিগত এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক একটি খবর। আমরা সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের তরুণ উদ্যোক্তা যারা আছে, যারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদেরকে উৎসাহিত করবে। আর যারা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান, ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চান এবং যাদের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন আছে, যাদের অর্থের প্রয়োজন আছে; আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ব্যাংক যেগুলো আছে যারা বিনিয়োগ করতে কিংবা লোন দিতে আগ্রহী, সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ সাধনে অবশ্যই ভূমিকা রাখব।

প্রতিনিধি/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর