বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর চাকরি হারানো, সংসারে অভাব-অনটন আর পারিবারিক দায়িত্বের চাপ—সব মিলিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। একসময় মনে হয়েছিল, হয়ত আর উচ্চশিক্ষা অর্জন করা হবে না। কিন্তু জীবনের প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি উম্মে হাবিবা রত্না। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা ও চাকরি। অর্জন করেছেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। স্বল্প বেতনের প্রকল্পকর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে বর্তমানে তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের স্থায়ী কর্মী।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার উম্মে হাবিবা রত্নার এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
স্বপ্নের শুরু, তারপর কঠিন বাস্তবতা
উম্মে হাবিবা রত্নার বাবার বাড়ি নড়াইলের কালিয়া পৌরসভার মির্জাপুর গ্রামে। তার বাবা রুহুল শেখ ও মা আসমা বেগম। বর্তমানে তিনি কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানাধীন খাশিয়াল ইউনিয়নের শুড়িগাতী গ্রামে স্বামীর সংসারে বসবাস করছেন।
২০১৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তার। নতুন সংসার, নতুন পরিবেশ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল নানা স্বপ্ন। বিয়ের সময় তার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তার উপার্জনেই চলছিল সংসার। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারান স্বামী। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় সংসারের নিয়মিত আয়ের পথ। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া রত্নার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে নতুন সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। তবুও মনের মধ্যে লালন করা শিক্ষার স্বপ্ন হারিয়ে যেতে দেননি।
অভাবের সংসারেও ছাড়েননি পড়াশোনা
আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রত্না। তার বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের বিষয় নয়; এটি একজন নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয় এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ তৈরি করে।
কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান তার স্বামী। সংসারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্ত্রীকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন তিনি। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রত্না। তবে সেখানেই থেমে থাকেননি। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন মুন্সি মানিক ডিগ্রি কলেজে।
সংসারের কাজ শেষ করে পড়াশোনার জন্য সময় বের করা এবং পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে শিক্ষাজীবনের সমন্বয় করা ছিল তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম। অবশেষে সেই পরিশ্রমের ফল পান। অর্জন করেন স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি।
স্বল্প বেতনের চাকরিতে শুরু নতুন লড়াই
পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর ইচ্ছাও ছিল রত্নার। স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় চাকরির চেষ্টা শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে ব্র্যাকে প্রকল্পকর্মী হিসেবে কাজের সুযোগ পান। শুরুর বেতন খুব বেশি না হলেও চাকরিটি তার জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
নিজের উপার্জন দিয়ে সংসারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান তিনি। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন ও নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। চাকরি, পড়াশোনা ও সংসারের দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না। তবুও দমে যাননি রত্না।
চাকরির পাশাপাশি মাস্টার্স, পূরণ হলো আরেক স্বপ্ন
একসময় যে নারীর উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনাই বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সেই নারীই চাকরি ও সংসারের দায়িত্ব সামলে অর্জন করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও পড়াশোনার জন্য সময় বের করে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি।
এই অর্জন তার কাছে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি নয়, বরং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও পরিশ্রমের ফল।
পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও এগিয়ে যেতে থাকেন রত্না। ব্র্যাকে প্রকল্পকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পান। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকে কর্মরত। আগের তুলনায় তার আয় বেড়েছে। নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখছেন। তার স্বামীও বর্তমানে কর্মজীবনে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। ফলে অতীতের আর্থিক সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে তাদের পরিবার।
মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের সমন্বয়
উম্মে হাবিবা রত্না এখন দুই সন্তানের মা। বড় ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, ছোট ছেলের বয়স তিন বছর। স্বামী, দুই সন্তান ও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে তার সংসার। সন্তানদের লালন-পালন, তাদের পড়াশোনা ও যত্ন, সংসারের কাজ এবং কর্মস্থলের দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করে চলছেন তিনি।
রত্না বলেন, একজন নারীর সফলতার পেছনে নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতা তার শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে। তার মতে, সংসারের দায়িত্ব শুধু নারীর একার নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকলে একজন নারীও নিজের মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পান।
‘বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব স্বপ্নপূরণের বাধা হওয়া উচিত নয়’
নিজের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উম্মে হাবিবা রত্না জানান, বিয়ের পর স্বামীর চাকরি হারানোয় তাদের সংসারে কঠিন সময় নেমে এসেছিল। আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও তিনি শিক্ষার স্বপ্ন ছাড়েননি। নিজের চেষ্টা ও পরিবারের সহযোগিতায় উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন।
রত্না বলেন, বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব কোনো নারীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও চেষ্টা চালিয়ে গেলে একজন নারী নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। গ্রামীণ নারীদের প্রতি তার আহ্বান, নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। শিক্ষা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদেরও সহযোগিতা করতে হবে।
রত্নার এমন অর্জনে খুশি পরিবারের সদস্যরাও। তার স্বামী খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর এই অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। সে সব সময় চেষ্টা করেছে নিজের যোগ্যতায় কিছু করার। আমি শুধু পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। তার এই সাফল্যে আমাদের পুরো পরিবার খুশি। সকলের কাছে তার জন্য দোয়া কামনা করছি, যেন ভবিষ্যতে আরও সাফল্য অর্জন করতে পারে।’
প্রতিনিধি/এসএস




