কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় বাড়ছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এ অবস্থায় ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই প্রতিদিন ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। এতে নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এদিকে আগুনের উৎস ও গ্যাসের প্রকৃতি নিয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নতুন তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ও পেট্রোবাংলা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এটি ভূগর্ভের অগভীর কোনো গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার থেকে নির্গত হচ্ছে। গ্যাসের উৎস ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আগামী ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন হলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় আগুনের প্রকৃতি, গ্যাস নির্গমনের মাত্রা এবং আশপাশের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন বিকেল চারটার পর ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকে আগুন দেখতে এসে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। অথচ গ্যাসের প্রবাহ ও আগুনের প্রকৃতির কারণে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর পর ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়।

পরে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ভূগর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বাপেক্সের একটি কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগুনের উৎস ও আশপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
আদেশে ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে—এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এলাকায় মাইকিংয়ের পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা দিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, বাপেক্সের পক্ষ থেকে ৭২ ঘণ্টার একটি সময়সীমার কথা জানানোয় তারা আশা করেছিলেন, এর মধ্যে আগুনের তীব্রতা কমে আসবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, আগুনের তীব্রতা তত বাড়ছে। কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা স্থাপনের পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে তারা আশা করছেন।
আরেক বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, আগুনের কারণে সড়কের দুই পাশ দিয়ে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। যানবাহন নিয়ে চলাচল করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দূরবর্তী পথ ঘুরে যাতায়াত করার সামর্থ্য সবার নেই। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াতে দুর্ভোগ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল আলম বলেন, ঘটনার তিন দিন পর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া উপেক্ষা করেই উৎসুক মানুষ ঘটনাস্থলের আশপাশে ভিড় করছেন। এভাবে মানুষের সমাগম অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
১৫ দিন পর্যবেক্ষণ, পরে রিলিফ কূপের সিদ্ধান্ত
শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হচ্ছে। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় একটি সভা হয়েছে।
সভায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। তবে আগুনের শিখার রং দেখে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার বিষয়টিও অনুমান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আগুনের উৎসকে ভূগর্ভের একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত বাংলাদেশে ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে ইনানীর এ ঘটনার প্রকৃত উৎস ও গ্যাসের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
মো. শোয়েব আরও বলেন, ১৫ দিন পরও যদি আগুনের শিখার উচ্চতা বৃদ্ধি পায় কিংবা একই রকম থাকে, তাহলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মূল গ্যাস নির্গমনের পথের পাশে আরেকটি কূপ খনন করে প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি জানান, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূগঠনে পরিবর্তনের কারণে এভাবে গ্যাস নির্গমন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে সেখানে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
চার দিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ে একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাসের উৎস ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মানুষের ভিড় পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি আপাতত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিনিধি/এমএইচআর




