নিরাপদে ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় নেমেছেন হাজারো জেলে। রুপালি ইলিশের আশায় চাঁদপুরের প্রায় ৭০ কিলোমিটার নৌসীমায় মাছ ধরছেন তারা। কিছু জেলে ইলিশ, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে ফিরছেন ঘাটে। এতে সরগরম হয়ে উঠেছে নদীতীরবর্তী মাছের আড়তগুলো। তিন সপ্তাহের বিরতি শেষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা। তবে ইলিশের দাম কমেনি। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বড় আকারের ইলিশ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা মাছঘাটে জেলেদের মাছ আহরণ ও কেনাবেচার চিত্র দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকেই ইলিশ ধরতে পদ্মা-মেঘনায় নামেন অনেক জেলে। ভোরের আলো ফোটার পর মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে শুরু করেন তারা। হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে একের পর এক জেলেনৌকা ভিড়তে থাকে। জেলেরা প্লাস্টিকের ট্রেতে করে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে আসেন।
এই মাছঘাটে ছোট-বড় প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। জেলেরা এসব আড়তে মাছের স্তূপ করেন। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁকডাকে জমে ওঠে বেচাকেনা। এ ঘাটে মাছ সংরক্ষণ করে বিক্রির প্রবণতা খুবই কম। শহরে খুচরা বিক্রির জন্য এক শ্রেণির ব্যবসায়ী এবং বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বিক্রির জন্য অন্য ব্যবসায়ীরা এখান থেকে তাজা ইলিশ কিনে নিয়ে যান।

ঘাটসংলগ্ন গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার বলেন, রাতে নদীতে নেমে ভোরে ঘাটে এসে ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। এভাবে ইলিশ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
আরেক জেলে আবুল কালাম খান বলেন, তারা সাতজন মিলে মধ্যরাতে নদীতে নেমেছিলেন। ধরা ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। কিছুক্ষণ পর আবারও মাছ ধরতে নদীতে নামবেন তারা। কয়েক দিন পর ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে বলেও জানান তিনি।
ঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমবে না বলে তার ধারণা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
তিনি আরও বলেন, কিছু জেলে ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও পাচ্ছেন। বড় আকারের পাঙাশ প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট আকারের পাঙাশ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকলে দাম কমবেশি হতে পারে।

আরেক আড়তদার মো. সেলিম বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজ ও আগামীকাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলে ইলিশের সরবরাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ, আগের বছরগুলোতে দুই দিন পর ইলিশের সরবরাহ কমে যেতে দেখা গেছে।
এই ঘাটের আড়তদার ইব্রাহীম মিয়া বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে বড় আকারের ইলিশ বেশি আসছে। ছোট আকারের ইলিশের সংখ্যা খুবই কম। ইলিশের পরিমাণ কম হলেও পাঙাশ পাওয়ায় জেলেরা কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন।
হরিণা মাছঘাটের প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল বলেন, এ সময় নদীতে ইলিশে ভরপুর থাকার কথা ছিল। কিন্তু অভিযান দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এক শ্রেণির জেলে মা ইলিশ শিকার করেছেন এবং প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় দুটি অভিযান কঠোরভাবে পরিচালিত হওয়ায় জেলেরা সুফল পাচ্ছেন। তারা ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও পাচ্ছেন। সরকারি উদ্যোগে পাঙাশের উৎপাদন ও বেড়ে ওঠার জন্য প্রকল্প নেওয়া হলে এ মাছও ইলিশের মতো জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিনিধি/এসএস




