বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

শীতের আগেই খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত চুয়াডাঙ্গার গাছিরা

মিজানুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

শীতের আগেই খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত চুয়াডাঙ্গার গাছিরা

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। রস ও গুড় উৎপাদনকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার গাছিরা। খেজুর গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা, পুরোনো অংশ ছাঁটা এবং রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে চলছে নানা কাজ। শীতের তীব্রতা বাড়লে এসব গাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে ঐতিহ্যবাহী ঝোলা গুড় ও নলেন পাটালি।

চুয়াডাঙ্গার গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনের ঐতিহ্য। প্রতিবছর শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছিরা খেজুর গাছ পরিচর্যায় নেমে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাঠের আইল, রাস্তার পাশ, পুকুরপাড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছগুলো পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিদের পদচারণায় মুখর।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেলগাছি গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, কোমরে দড়ি বেঁধে হাতে ধারালো দা নিয়ে একের পর এক খেজুর গাছে উঠছেন গাছিরা। নিপুণ হাতে পরিষ্কার করছেন গাছের মাথার পুরোনো ডালপালা ও মরা অংশ। এরপর গাছের নির্দিষ্ট অংশ চেঁছে রস বের হওয়ার উপযোগী করে তুলছেন। কয়েক ধাপে পরিচর্যার কাজ শেষ হলে গাছে বাঁধা হবে রস সংগ্রহের হাঁড়ি। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে রস সংগ্রহের মূল কার্যক্রম।

Chuadanga_Khejur_(14)

তবে খেজুর গাছ প্রস্তুতের কাজ সহজ নয়। উঁচু গাছে উঠে ধারালো দা দিয়ে কাজ করতে হয় গাছিদের। সামান্য অসতর্কতায় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও শারীরিক পরিশ্রমের সমন্বয়ে তারা এ কাজ করেন। জীবিকার তাগিদে বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অনেকে।

0e6f5659-354f-47c8-a545-de2a7a88d93b

গাছিদের ভাষ্য, ভালো মানের রস পেতে মৌসুমের শুরুতেই সঠিকভাবে গাছ প্রস্তুত করা জরুরি। পরিচর্যায় ত্রুটি থাকলে রস সংগ্রহে সমস্যা হতে পারে। তাই শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই গাছ পরিচর্যার কাজ শেষ করতে চান তারা। মৌসুমজুড়ে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে পরিবারের আয় বাড়ানোর প্রত্যাশা তাদের।

গাছি ফজলু হোসেন বলেন, খেজুর গাছে ওঠা থেকে শুরু করে গাছ কাটার প্রতিটি ধাপেই সতর্ক থাকতে হয়। উঁচু গাছে উঠে ধারালো দা দিয়ে কাজ করায় ঝুঁকি থাকে। তবে শীত মৌসুমে রস ও গুড় বিক্রি করে যে আয় হয়, তা তদের পরিশ্রমের বড় প্রাপ্তি।

c4e4aeb8-dd88-4562-ab8d-8342f6c9a511

আরেক গাছি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাছ পরিচর্যার মধ্য দিয়ে তাদের মৌসুমের কাজ শুরু হয়। এরপর রস সংগ্রহ, জ্বাল দেওয়া ও গুড় তৈরির ব্যস্ততা চলে। সারা বছরের অপেক্ষার পর এই সময়টিই তাদের আয়ের অন্যতম সুযোগ।

চুয়াডাঙ্গার খেজুরের গুড় ও নলেন পাটালির সুনাম রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শীতের পিঠা, পায়েসসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরিতে এই গুড়ের চাহিদা থাকে। ফলে শীত মৌসুমে রস ও গুড় উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। গাছিদের পাশাপাশি গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত পরিবার ও ব্যবসায়ীরাও এর সুফল পান।

411b553e-8ffe-4895-adbf-559b5c755333

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ নূরুল ইসলাম বলেন, খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গার নলেন পাটালির সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। শীত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক পরিবার বাড়তি আয়ের সুযোগ পায়।

bf4abcbf-b246-4802-9c35-ed7c8f30cadf

তবে খেজুর গাছে উঠে পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন জেলায় গাছে ওঠার জন্য মইজাতীয় আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এসব সরঞ্জাম গাছিদের পরিশ্রম ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। চুয়াডাঙ্গাতেও পর্যায়ক্রমে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার চালু হলে গাছিরা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস সংগ্রহ ও মানসম্মত গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব।

শীতের সকাল এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। তবে তার আগেই গাছিদের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে নতুন মৌসুমের আগমনী বার্তা। আর কিছুদিন পরই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে খেজুরের রস জ্বালানোর ধোঁয়া আর নতুন গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। সেই অপেক্ষায় স্বপ্ন বুনছেন চুয়াডাঙ্গার গাছিরা।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর