কক্সবাজারে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ উচ্ছেদে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি চারতলা রিসোর্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানী এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদফতর এবং আনসার সদস্যরা অংশ নেন।
উচ্ছেদ করা ভবনটি ইনানীতে নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে, তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপের দক্ষিণে এবং আরেক তারকা হোটেল বে ওয়াচের উত্তরে অবস্থিত।
সোমবার সকাল ১১টার দিকে ভবনটির সামনে এক্সকাভেটরসহ উচ্ছেদ অভিযানের সরঞ্জাম নেওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকেরাও সেখানে উপস্থিত হন। অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকার লোকজন ভিড় করেন। দুপুরের দিকে ভবনটির নিচে ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়। পরে চারতলা ভবনটির কাচ ভেঙে মূল ভবনের পিলার অপসারণের কাজ শুরু হয়।
কউকের কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদন ছাড়া নির্মিত ভবনটি নিজ উদ্যোগে অপসারণের জন্য মালিকপক্ষকে চার দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নোটিশ দেওয়ার পরও ভবনটি অপসারণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
তবে ভবনটির মালিক শহিদুল হক দাবি করেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি শিগগিরই উদ্বোধনের কথা ছিল।
নোটিশের জবাব দেওয়া হয়নি—কউকের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে শহিদুল হক বলেন, চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছেন তিনি। ভবন নির্মাণের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে। কিন্তু কেউ সেগুলো আমলে নিচ্ছে না।

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের পর অভিযান
গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে কউকের অনুমোদন ছাড়া গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এসব স্থাপনার বেশির ভাগই কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত এবং অনুমোদনহীন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি এসব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে কউকের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও যারা স্থাপনা সরিয়ে নেননি, তাদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে কোনো অবৈধ স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।
কউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ২০০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। তারকা মানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই।

৫০০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ।
তিনি বলেন, কউকের অনুমোদন না পেলে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনুমতিও পাওয়া যায় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক জানান, যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাগজপত্র রয়েছে, কিন্তু অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করতে ব্যবসায়ীরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২৬ রিসোর্ট ও ১০ রেস্তোরাঁকে নোটিশ
পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার অভিযোগে সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে সরকার মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণা করে।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, মেরিন ড্রাইভে ব্যাঙের ছাতার মতো বেশ কিছু রিসোর্ট-কটেজ নির্মিত হয়েছে। তারাও চান, অবৈধ হোটেল-রিসোর্টগুলোকে আইনের আওতায় আনা হোক। কারণ, টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় কক্সবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, তাদের সমিতিতে সদস্যসংখ্যা ১৮৭। সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেল-গেস্টহাউসের অনুমোদন রয়েছে। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্র আছে কি না, তা তার জানা নেই।
প্রতিনিধি/এসএস




