সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সিরাজগঞ্জে তিন ফসলি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন, কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

ইউসুফ দেওয়ান রাজু, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

সিরাজগঞ্জে তিন ফসলি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন, কঠোর অবস্থানে প্রশাসন
অবৈধ পুকুর খননের চেষ্টা। ছবি: ঢাকা মেইল

‘শস্যভাণ্ডার’ হিসেবে খ্যাত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় তিন ফসলি আবাদি উর্বর জমি কেটে অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। যেখানেই অবৈধ পুকুর খনন হবে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ।

জেলা প্রশাসক ও জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বারুহাস ইউনিয়নের কাজিপুর গ্রামের মো. দুদু মিয়া একটি অবৈধ পুকুর খনন করছিলেন। পুকুরের মাটি দেদারসে বিক্রি করা হচ্ছে, পাশাপাশি সরকারি খাল মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। এমন গোপন সংবাদে গত শনিবার রাতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অবৈধ পুকুর খননের অপরাধে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়, মাটিবাহী কয়েকটি গাড়ির যন্ত্রাংশ ভেঙে দেওয়া হয় এবং মাটি কাটার এস্কাভেটরটি পুকুর থেকে তুলে দেওয়া হয়।

এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর প্রকাশ্যেই উর্বর জমি কেটে অবৈধ পুকুর খনন করা হয়। এর প্রতিবাদে তারা একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও কৃষক সমাবেশ করলেও বিগত বছরগুলোতে প্রশাসন কার্যকরভাবে একটি পুকুর খননও বন্ধ করতে পারেনি। কৃষকরা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন, কবে বন্ধ হবে এই অবৈধ খনন।

কৃষক আব্দুর রহিম, মোতালেব হোসেন, আরমান আলী, আব্দুস সবুর, জিল্লুর রহমান, আব্দুল কাদের, এসাহাক সরকার, শাহআলম প্রামাণিক বলেন, কতিপয় জমির মালিক হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকার কথা না ভেবে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। যত্রতত্র পুকুর খননের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তাড়াশ সদর ইউনিয়নের মাধবপুর, মথুরাপুর, বোয়ালিয়া, সোলাপাড়া, চক গোপিনাথপুর ও বিদিমাগুড়া গ্রামের কৃষকরা জানান, মাঠে মাঠে পানি আটকে থাকায় জমি কচুরিপানা ও ঘাসে ভরে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সাত বছর ধরে তারা কোনো ফসল আবাদ করতে পারছেন না, পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জানা গেছে, কাউরাইল ও সোলাপাড়া এলাকায় এখনো কয়েকটি অবৈধ পুকুর খনন চলছে। সরেজমিনে গতকাল দেখা গেছে, দুদু মিয়ার পুকুরে এস্কাভেটর নেই, মাটিবাহী গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এস্কাভেটরটি প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে বিনসাড়া বাজারের পাশে একটি পরিত্যক্ত স্থানে রাখা হয়েছে।

সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, পুকুর খনন বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে পুকুর খনন বন্ধ করা সম্ভব। 

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, তাড়াশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানকার বেশিরভাগ জমিতে বছরে তিনবার ধান ও রবিশস্য আবাদ হয়। মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র সব দায়ভার নিয়ে কৃষকদের পুকুর খননে উৎসাহিত করছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দশকে তাড়াশে সাড়ে চার হাজারের বেশি অবৈধ পুকুর খনন হয়েছে, এতে প্রায় ১৩ হাজার বিঘা কৃষিজমি কমেছে।

এ প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, গত শনিবার রাতে একটি পুকুরে অভিযান চালিয়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। খননকৃত পুকুরটি থেকে যদি সামান্য পরিমাণ মাটিও কাটা হয়, তাহলে আর জরিমানা নয়, সরাসরি জমির মালিককে জেল দেওয়া হবে।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে বিগত বছরগুলোর তুলনায় প্রশাসন এবার অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেখানে পুকুর খনন হবে সেখানে অভিযান চলবে। এক কথায় পুকুর খননের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর