রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

এক মুঠো ভালোবাসায় সাজছে ১৫৮ সংসার, মানবতার ফেরিওয়ালা মামুন বিশ্বাস

ইউসুফ দেওয়ান রাজু, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

এক মুঠো ভালোবাসায় সাজছে ১৫৮ সংসার, মানবতার ফেরিওয়ালা মামুন বিশ্বাস
নবদম্পতির সঙ্গে মামুন বিশ্বাস। ছবি: ঢাকা মেইল

রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। আত্মীয়তার বন্ধনও নেই। নেই জমি-জমা বা উত্তরাধিকারের হিসাব। তবু সিরাজগঞ্জের ১৫৮টি পরিবারে একটি মানুষের পরিচয় একটাই — ‘বাবা’। কনের বিদায়বেলায় যে মানুষটি চোখের জল আড়াল করে হাসেন, বরপক্ষের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে বলেন— ‘আমার মেয়েটাকে দেখে রাইখেন’, তিনি মামুন বিশ্বাস।

সিরাজগঞ্জে শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালি গ্রামের স্কুলশিক্ষক মাহবুবুল হোসেনের ছেলে মামুন বিশ্বাস। বয়স মাত্র ৩৮। পেশায় সমাজকর্মী। গত ১০ বছরে অর্থের অভাবে আটকে থাকা ১৫৮ জন মেয়ের বিয়ের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বেনারসি শাড়ি, গহনা, বিয়ের মঞ্চ, আলোকসজ্জা, ডেকোরেটর, কনের মেহেদি থেকে শুরু করে তিন শতাধিক অতিথির খাবার— সবকিছুর আয়োজন করেছেন মানুষের সহযোগিতায়।

01

ফেসবুক থেকে মানবতার সেতুবন্ধন
মামুনের এই পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। কোথাও কোনো অসহায় মেয়ের বিয়ে টাকার অভাবে আটকে গেছে— এমন খবর পেলেই তিনি ছুটে যান। যাচাই-বাছাই করে ছবি, ভিডিওসহ ফেসবুকে একটি আবেদন লেখেন।

‘একটি বোনের বিয়ে আটকে আছে, আসুন আমরা সবাই মিলে তার মুখে হাসি ফোটাই’— এমন একটি লাইনেই জড়ো হয় দেশ-বিদেশের শত শত মানুষ। কেউ ১০০ টাকা, কেউ ৫০০, কেউ ৫০ হাজার— ভালোবাসার সেই অর্থ দিয়েই সাজে একটি নতুন সংসার। টাকা পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে বাজার করা, বিয়ে পড়ানো পর্যন্ত পুরো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন মামুন।

তিনটি মেয়ে, তিনটি ফিরে আসার গল্প
আতিয়া খাতুনের দুইবার ভাঙা স্বপ্ন: কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঘরি গ্রামের আতিয়া। বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ, কর্মক্ষম নন। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। অভাবের সংসারে মেয়ের বিয়ের কার্ড ছাপা হয়েছিল দুইবার, দুইবারই ভেঙে গেছে টাকার অভাবে। লজ্জায় ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল মেয়েটি। খবর পেয়ে মামুন ফেসবুকে পোস্ট দেন। মাত্র ৭ দিনে জমা হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ধুমধাম করে আতিয়ার বিয়ে হয়। সেদিন তার হাতে মেহেদি, চোখে জল— তবে সেই জল আনন্দের।

আতিয়া বলেন, ‘দুইবার বিয়ে ভাঙার পর ভেবেছিলাম আমার আর বিয়ে হবে না। মামুন ভাই আমাকে বাবার মতো করে বিদায় দিয়েছেন।’

02

সুচিত্রা রানী দাসের ভাড়া বাসার বিয়ে: একই উপজেলার জামতৈল গ্রামের সুচিত্রা। নিজেদের এক টুকরো জমিও নেই। ভাড়া বাসায় থাকেন। তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বিয়ের খরচ ছিল স্বপ্নেরও বাইরে। তিনবার বিয়ে ঠিক হয়ে ভেঙে যায়। মামুন জানতে পেরে আবারও আবেদন করেন। মাত্র পাঁচ দিনে ওঠে ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। গত ১ অক্টোবর সুচিত্রার সঙ্গে পলাশ কুমার ভৌমিকের বিয়ে হয়। শুধু বিয়ে নয়, মেয়ের মা কামনা রানী দাসের হাতে সংসার চালানোর জন্য নগদ ২১ হাজার টাকাও তুলে দেন মামুন।

ছয়বার বিয়ে ভাঙা নন্দিনী: উল্লাপাড়ার বড়হর ইউনিয়নের ধুনচি গ্রামের নন্দিনী। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, বাঁশের কুলা বানিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিবেশীর দেওয়া পুরনো কাপড়ে বড় হয়েছেন দুই বোন। নন্দিনীর বিয়ে ঠিক হয়েছে ছয়বার, ভেঙেছে ছয়বারই। শেষবার মেয়েটি বলেছিল, ‘আমার আর বিয়ে লাগবে না মা।’ সেই নন্দিনীর খবর পেয়ে মামুন সংগ্রহ করেন ২ লাখ ১২ হাজার টাকা। নতুন বেনারসিতে সাজে নন্দিনী।

বিয়ের বাইরেও যে মানুষটি
১৫৮টি বিয়ে শুধু সংখ্যা নয়, মামুনের মানবিকতার একটি অংশ মাত্র। যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে অসহায় পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ, বন্যার সময় খাদ্য সহায়তা, কাউকে গরু-ছাগল কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী করা, কাউকে মুদি দোকান করে দেওয়া— এমন অসংখ্য কাজ করেছেন তিনি। নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন পাখির অভয়াশ্রম, যেখানে শীতের অতিথি পাখিরা নিরাপদে থাকে।

হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ করেননি কখনো। বাকতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের বিয়ের দায়িত্বও নিয়েছেন।

03

শুরুটা যেভাবে মামুন বিশ্বাসের
স্থানীয় ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ বলেন, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে খুকনী গ্রামে একটি চায়ের দোকানে ফেরদৌস নামে এক প্রতিবন্ধী শিশুকে অন্য শিশুরা নির্যাতন করছিল। দৃশ্যটি দেখে মামুনের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সেদিন রাতেই তিনি ফেসবুকে প্রথম সাহায্যের আবেদন লেখেন। সেখান থেকেই শুরু।

শুরুতে অনেকে উপহাস করেছিল, বলেছিল— ‘ফেসবুকে ভিক্ষা করছে’। কিন্তু স্কুলশিক্ষক বাবা মাহবুবুল হোসেন ছেলেকে বলেছিলেন, ‘মানুষ কী বলল- তা দেখিস না, তুই তোর কাজ করে যা।’ সেই সাহসেই আজ ১৫৭ পরিবারের বাবা সে।

জাতীয় তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, ইচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে যে অসহায় মেয়েদেরও রাজকন্যার মতো করে বিয়ে দেওয়া যায়, মামুন তা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

নিজের কথা
এতকিছুর পরও নিজের কৃতিত্ব নিতে নারাজ মামুন। তিনি বলেন, আমি কিছুই করিনি। ১৫৮টি বিয়ের সব কৃতিত্ব আমার ফেসবুক বন্ধুদের। আমি শুধু মাধ্যম। তারা টাকা না দিলে আমি কিছুই করতে পারতাম না। মানুষের ভালোবাসা থাকলে আরও ৫০০ মেয়ের বাবা হতে চাই, ইনশাআল্লাহ।

যমুনার চর থেকে শহরের অলিগলি— যেখানে অসহায়ত্ব, সেখানেই মামুন বিশ্বাস। তার কাছে ১৫৮টি বিয়ে মানে ১৫৮টি অনুষ্ঠান নয়, ১৫৮টি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস মুছে নতুন স্বপ্নের শুরু। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও যে বাবা হওয়া যায়, অভিভাবক হওয়া যায়— মামুন বিশ্বাস তার জীবন্ত প্রমাণ। এটি শুধু একজন সমাজকর্মীর গল্প নয়, এটি মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার গল্প।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর