বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার পাহাড় ঘেরা অংজাই পাড়ার আঁকাবাঁকা পথ পেরোলেই চোখে পড়ে সবুজে মোড়ানো একেকটি ফলদ বাগান। সারি সারি গাছে ঝুলছে বিভিন্ন ধরনের ফল। আম্রপালি, লিচু, কিউজাই, প্রিমিয়াম মিয়াজাকি, সূর্য ডিম, কাজুবাদাম, কফি, লটকন ও কুলসহ নানা জাতের ফল চাষ করে পাহাড়ের বুকে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুনেছেন কৃষকেরা। কিন্তু সেই স্বপ্নের শিকড়েই এখন পানির সংকট। বছরের পর বছর বিনিয়োগ আর ঋণ করে গড়ে তোলা বাগানগুলোতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পেরে শুকিয়ে যাচ্ছে গাছ। যার কারণে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছেন তারা।
রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে বেংছড়ি পাড়া, খাব্রে পাড়া, অংজাই পাড়া, লুংলাই পাড়া, বিক্রমণী পাড়া ও মুনথার পাড়ার প্রায় ৯২টি পরিবার এই সংকটের মুখে। এসব এলাকায় প্রায় শত একর জমিতে গড়ে উঠেছে মিশ্র ফলদ বাগান। কোনো কোনো পরিবারের রয়েছে পাঁচ থেকে ১৫ একর পর্যন্ত বাগান। অথচ যে বাগান তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেই বাগানই এখন পানির অভাবে হয়ে উঠছে আর্থিক দুর্ভোগের কারণ।

পাহাড়ের ঢালে নিজের জমিতে ফলদ বাগান গড়ে তুলেছেন চশৈনু মারমা। মৌসুমের আগেই গাছের পরিচর্যা, সার, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচে বিনিয়োগ করেন সঞ্চিত অর্থ। প্রত্যাশা থাকে, ফল বিক্রির আয় দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবেন, শোধ করবেন আগের দেনা, স্বস্তি ফিরবে সংসারে। কিন্তু সেচের পানির অভাবে গাছ শুকিয়ে গেলে সেই প্রত্যাশার জায়গা নেয় হতাশার। কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে লাভের বদলে বাড়ে ঋণের বোঝা।
এই সংকটের মূল কারণ পানির অপ্রতুলতা। বাগানগুলোতে সেচ দেওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎসটি প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে শ্রমিক দিয়ে পানি বহন করে আনতে প্রতি লিটারে খরচ পড়ে প্রায় দুই টাকা। পাহাড়ি পথ বেয়ে পানি সংগ্রহের এই ব্যয় বহন করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। ফলে গাছে পানি দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতায় অনেক সময় তা সম্ভব হয় না। আর সেচের অভাবে ব্যাহত হয় গাছের বৃদ্ধি, কমে যায় ফলন ও ফলের গুণগত মান। স্থানীয় ফলচাষি অংশৈনু মারমার কণ্ঠে ঝরে পড়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও প্রত্যাশা। তিনি বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করি, কিন্তু পানির অভাবে চোখের সামনে বাগান শুকিয়ে যেতে দেখি। ঠিকমতো সেচের ব্যবস্থা হলে আমাদের উৎপাদন এখনকার চেয়ে তিন গুণ বাড়ত। ফলের গুণগত মান ও স্বাদও আরও ভালো হতো। আমরা শুধু বাঁচতে চাই। সরকারের কাছে একটাই আকুতিআমাদের একটু পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।
_20261025_091408395.jpg)
একই সংকট বেংছড়ি পাড়ার মিশ্র ফলদ বাগানের চাষি উবায়ই মারমারও। পরিবারের শ্রমেই তিনি বাগান পরিচর্যা করেন। কিন্তু পানির অভাবে সেই শ্রমের যথাযথ প্রতিদান মিলছে না। উবায়ই মারমা বলেন, ঝিরি থেকে পানি তুলতে অনেক কষ্ট হয়। শীতকাল এলে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। আমার স্ত্রী আর আমি মিলে সারাদিন বাগানে কাজ করি। কিন্তু পর্যাপ্ত পানির অভাবে ফলন ভালো হয় না।
এই দুই কৃষকের অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের চিত্র নয়, বরং পাহাড়ের কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। যে বাগান তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, পানির অভাবে সেই বাগানই এখন অনিশ্চয়তার উৎস।

পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে ফলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, পানির সংকট তা কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করছেন, উন্নত জাতের ফলের চারা লাগাচ্ছেন, পরিচর্যায় শ্রম দিচ্ছেন। কিন্তু সেচের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ছে।
শীতের শুরুতেই পানির সংকট মোকাবিলায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল ইসলাম জানান, পাহাড়ে বড় পরিসরে ফলবাগান গড়ে তুলতে হলে হাফ-মুন কাটিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। সারা বছর সেচের পানির চাহিদা পূরণে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই মালচিং উপকরণ সংগ্রহ করে গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে, যাতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায়। বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক বোতলের মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা সেচ বা ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অধিক ফলন ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে একাধিক চাষিকে সমন্বিত করে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।

এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপন হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প। উপযুক্ত পানির উৎস, সেচ অবকাঠামো ও পানি বণ্টনব্যবস্থা নিশ্চিত করে সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা গেলে দূর থেকে পানি বহনের ব্যয় ও শ্রম কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বাড়তে পারে ফলের উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং বাগানভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ। তবে এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি সমীক্ষা, টেকসই পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।
আরও পড়ুন
কৃষকদের দুর্ভোগের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বান্দরবান জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, চাষিদের পানির সংকট নিরসনে নতুন অর্থবছরে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের বিশেষ প্রস্তাবও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে এই পানিসংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রতিনিধি/টিবি




