শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

শ্রমিকদল নেতার কার্যালয়ে আটকে ‘নির্যাতন’, সিসিটিভি ফুটেজে নতুন মোড়

জেলা প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

শ্রমিকদল নেতার কার্যালয়ে আটকে ‘নির্যাতন’, সিসিটিভি ফুটেজে নতুন মোড়
সিসিটিভির ফুটেজ ও অভিযুক্ত শ্রমিকদল নেতা খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়। ছবি: ঢাকা মেইল

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে তিন যুবককে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে দুই সাংবাদিক কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। এতে ভূঞাপুর পৌর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার সকালে ঢাকা মেইলের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে একটি সুজুকি মোটরসাইকেল ও চালক এবং শ্রমিকদল নেতার সহযোগী পরিচয়ে এক ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফুটেজে শ্রমিকদল নেতা জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী সিয়াম এবং সংবাদকর্মী আরিফুজ্জামান তপুর উপস্থিতির বিষয়টিও দেখা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ফুটেজকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ভুক্তভোগীদের নির্যাতন, মারধর ও দুই সাংবাদিক কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় সম্প্রতি আরও অভিযোগে যার নাম আসছে তিনি ভূঞাপুর পৌর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়। তিনি ভূঞাপুর পৌর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান গিয়াস উদ্দিনের ছোট ভাই।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ অক্টোবর মামলার বাদী মাহিন ও তার দুই বন্ধু নিহাদ এবং শাকিল পূর্ব ভূঞাপুর এলাকায় এক বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠানে যান। তারা ধনবাড়ী উপজেলার বালাসূতি গ্রামের বাসিন্দা। বিয়ের অনুষ্ঠানে চলাচকালে সেখানে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

এ ঘটনায় ১০ অক্টোবর ভূঞাপুর থানায় একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী মাহিন। মামলায় দুই সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় কারাগারে থাকা দুই সংবাদকর্মী হলেন- ভূঞাপুর পৌর শহরের হাদী চকদার ও আরিফুজ্জামান তপু।

বাদীর অভিযোগ, ঘটনার দিন বর ও কনে পক্ষের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালে তারা ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় সংবাদকর্মী হাদী চকদার তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মুঠোফোন কেড়ে নেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে শ্রমিকদল নেতা জাহাঙ্গীর তার লোকজন নিয়ে সেখানে যান। ওই নেতার ডাকেই সেখানে দুই সংবাদকর্মী হাদী ও তপু উপস্থিত হন এবং পরে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে বাইরে যেতে বলা হয়।

ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, এরপর দুই সাংবাদিক তাদের ভূঞাপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরপাড় এলাকার রেখা কমপ্লেক্সে অবস্থিত শ্রমিকদল নেতা জাহাঙ্গীর আলমের হৃদয়ের নিজ কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে কয়েক দফায় তাদের শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের সময় সাংবাদিক তপুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। একপর্যায়ে শ্রমিকদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম কার্যালয়ে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চলে যান বলেও দাবি করা হয়।

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, পরদিন সকালে ভুক্তভোগীদের একজন করে এটিএম বুথে নিয়ে টাকা তুলতে বাধ্য করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ২ লাখ টাকা আদায়, নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ৩১ হাজার টাকা এবং তিনটি আইফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। যে নগদ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছিল, সেটি শ্রমিকদল নেতার সহযোগী সিয়ামের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পরে তাদের ভূঞাপুর থেকে ঘাটাইল উপজেলার লোকেরপাড়া এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। 

অভিযোগ আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি এবং পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রভাব দেখিয়ে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করানোর ভয় দেখানো হয়।

ভুক্তভোগী মামলার বাদী মাহিন বলেন, শ্রমিকদল নেতার তার কার্যালয়ে তিনি ডেকে নেন। পরে তার নেতৃত্বে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে কৌশলে সে তার কার্যালয় ত্যাগ করে বের হয়ে যায়। পরে ওই সাংবাদিকরা তাদের ব্যাংক একাউন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা টাকা হস্তান্তর করে। এতে গোবিন্দাসীর এক সাংবাদিকের ব্যাংক একাউন্টে দেড় লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয় বলেও জানান মাহিন।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত ভূঞাপুর পৌর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম হৃদয় সম্পক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন রাতে মাতব্বর হিসেবে দরবার করেছেন। তবে টাকা ও ফোন নেওয়ার ঘটনার সাথে নেই। ওই সাংবাদিকরা কি করেছে সেটা তাদের ব্যাপার।

ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম রেজাউল করিম জানান, বাদীর এজাহারের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। তদন্ত জাহাঙ্গীর আলমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকে অভিযোগে যুক্ত করা হবে।

উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বলেন, বিষয়টি তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে জেনেছেন। ওই শ্রমিকদল নেতা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ৮ অক্টোবর রাতে এ ঘটনাটি ঘটে। পরে ১০ অক্টোবর নির্যাতনের শিকার মাহিন সংবাদকর্মী হাদী চকদার ও আরিফুজ্জামান তপুর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে ভূঞাপুর থানায় একটি মামলা করেন। পরে ওই দুই সংবাদকর্মী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। তবে এজাহারে হাদী চকদার ১ নম্বর আসামি হলেও ঘটনার দায় ২ নম্বর আসামি আরিফুজ্জামান তপুর ওপর চাপানো হচ্ছে বলে তার পরিবারের স্বজনরা পক্ষ দাবি করছে। এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন ওই শ্রমিকদল নেতাসহ অজ্ঞাত কয়েকজন।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর