ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষায় সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে চলছে মা ইলিশ শিকার। নদীতে শত শত নৌকায় মাছ ধরার পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে বসছে অস্থায়ী বাজার। সেখানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মা ইলিশ। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা নদী ও নদীতীরবর্তী স্থানে মা ইলিশ শিকার ও কেনাবেচা চলছে। এর মধ্যে গোয়ালন্দ উপজেলার কাউয়ালজানি, মুন্সিবাজার, বেতকা ও কলাবাগান, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মেছোঘাটা, কালীতলা, মহাদেবপুর ও জৌকুড়া, কালুখালী উপজেলার হরিনবাড়িয়ার চর ও রতনদিয়া এবং পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ও বাহাদুরপুরসহ শতাধিক পয়েন্টে এমন চিত্র দেখা গেছে।
নদী থেকে মাছ ধরে নৌকা ঘাটে ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভিড় করছেন ক্রেতারা। নৌকায় কিংবা নদীর পাড়ে চলছে তাজা মা ইলিশের বেচাকেনা। দিনের আলোতেই চলছে এসব কার্যক্রম।

মৎস্যজীবী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জেলেদের অনেকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীতে নামছেন। তাদের দাবি, কার্ডধারী হয়েও অনেকে সরকারি খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি রয়েছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ।
আরও পড়ুন: ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু
দৌলতদিয়ার মৎস্যজীবী মো. রেজাউল মণ্ডল বলেন, ‘সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে আমরা সম্মান জানাই। কিন্তু আমাদের অনেকেই কোনো সরকারি সহায়তা পান না। যে সামান্য চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। তার ওপর রয়েছে কিস্তির চাপ। তাই বাধ্য হয়েই নদীতে নামতে হয়।’
একই অভিযোগ করেন জেলে আনোয়ার মণ্ডল, মো. জিয়া শেখ ও লালন। তাদের দাবি, তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও অনেক জেলে গত এক বা দুই বছর ধরে চাল বা খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না। সংসার চালাতে বাধ্য হয়েই তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করছেন।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রকাশ্যে মা ইলিশ শিকার ও বিক্রি চলতে থাকায় ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও দর্শনার্থীরা।
দর্শনার্থী জহুরুল ইসলাম হালিম বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যেভাবে প্রকাশ্যে মাছ ধরা ও বিক্রি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারির পাশাপাশি প্রকৃত জেলেরা যেন শতভাগ সরকারি সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলে ৬ হাজার ৩০৪ জন। তবে বরাদ্দের স্বল্পতার কারণে এবার খাদ্যসহায়তার চাল পাচ্ছেন ৫ হাজার ৫৯২ জন নিবন্ধিত জেলে। বাকি ৭১২ জন কার্ডধারী জেলে কোনো খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না।
মা ইলিশ রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক জানান, ইলিশের প্রজনন রক্ষায় প্রতিদিন নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত ১১ দিনে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ৩৯টি অভিযান ও সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ৬ লাখ ৫৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ১৪২ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি ১২ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড, ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১০ জেলের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
দৌলতদিয়া নৌপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ত্রিনাথ সাহা জানান, মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইলিশের প্রজনন রক্ষা ও ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের খাদ্যসহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।




