বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দশমীতে হিলি সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে দুই বাংলার মিলনমেলা

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

দশমীতে হিলি সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে দুই বাংলার মিলনমেলা

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে জড়ো হন বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। প্রিয়জন ও আত্মীয়স্বজনকে একনজর দেখতে বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকে সীমান্তের চেকপোস্ট ও শূন্যরেখাসংলগ্ন এলাকায় ভিড় করেন তারা। কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের ভূখণ্ডকে আলাদা করে রাখলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এদিন।

সকাল থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে হিলি সীমান্তে আসেন। ভারতের দিক থেকেও সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান নেন অনেকে। দুই দেশের মানুষের উপস্থিতিতে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে আনন্দের পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া স্বজনদের কাছে যেতে না পারার আক্ষেপও ছিল অনেকের চোখেমুখে।

সীমান্তের এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ মুঠোফোনে কথা বলে প্রিয়জনের খোঁজখবর নেন। আবার কেউ কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনকে একনজর দেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কাছাকাছি থেকেও কাছে যেতে না পারার কষ্ট তাদের বারবার নাড়া দেয়। তবু প্রিয়জনের মুখ দেখতে পাওয়ার আনন্দে অনেকের মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হিলি সীমান্তের দুই পাশে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের আত্মীয়স্বজন বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাস করেন। দেশভাগের পর ভূখণ্ড বিভক্ত হলেও অনেক পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে। সময়ের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্ব বেড়েছে, বেড়েছে যাতায়াতের আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু একে অপরের প্রতি টান কমেনি। ভিসা, পাসপোর্ট ও সীমান্তসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকের পক্ষে সহজে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয় না। তাই দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবের দিনে সীমান্তে এসে প্রিয়জনের একঝলক দেখার চেষ্টা করেন অনেকে।

4ec1f44f-b86c-4501-b418-30ae8931f85f

সীমান্তে আসা অভি বসাক বলেন, ‘ওপারে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। অনেক দিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। পূজার এই দিনে তাদের একনজর দেখার আশায় এখানে এসেছি। কাছে গিয়ে কথা বলতে পারি না, একসঙ্গে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করারও সুযোগ নেই। তারপরও দূর থেকে তাদের দেখতে পারলে মনটা ভালো হয়ে যায়। দুই দেশে থাকলেও আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন একই রকম।’

তিনি আরও বলেন, ‘উৎসবের দিনে পরিবারের সবাইকে কাছে পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সীমান্তের নিয়মের কারণে সব সময় তা সম্ভব হয় না। তাই দূর থেকে হলেও প্রিয়জনদের দেখতে পাওয়াটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।’

মৌমিতা সেন নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘দুর্গাপূজা আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এই উৎসবকে ঘিরে সবার মধ্যে আনন্দ থাকে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা থাকে। ওপারে আমাদের পরিচিত ও আত্মীয় মানুষজন রয়েছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করার আশায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সীমান্তে এসেছি। কাঁটাতারের কারণে কাছে যেতে না পারার কষ্ট রয়েছে। তবুও দূর থেকে তাদের দেখতে পেলেও মনে হয়, অন্তত কিছুটা হলেও মনের আশা পূরণ হয়েছে।’

আরও পড়ুন

দেবী যাচ্ছেন কৈলাসে, অপেক্ষা আরেক শরতের

তিনি আরও বলেন, ‘দুই পাশে দুটি দেশ হলেও মানুষের আবেগ তো আলাদা নয়। এপার বাংলার মানুষ যেমন পূজা উদ্‌যাপন করছেন, ওপার বাংলার মানুষও তেমনি আনন্দ করছেন। সবার মধ্যেই উৎসবের আনন্দ ও স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে।’

সীমান্তে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করারও উপলক্ষ। কিন্তু সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী অনেক মানুষের কাছে সেই আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়। দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া স্বজনদের কাছাকাছি দাঁড়িয়েও কাছে যেতে না পারার কষ্ট তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর মতো আবেগঘন দিনে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়ে ওঠে।

ce7a1e64-4efd-4781-a8a0-df9905f87056

তাদের প্রত্যাশা, দুই দেশের আইন ও সীমান্তের নিরাপত্তাব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে বিশেষ উৎসবের দিনে সীমান্তের দুই পাশে থাকা স্বজনদের মধ্যে সৌজন্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ ও আত্মিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করেন তারা। তবে এ ক্ষেত্রে সীমান্তের নিরাপত্তা, প্রচলিত নিয়মকানুন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেন দর্শনার্থীরা।

বিজয়া দশমী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি বিদায়েরও দিন। মণ্ডপে মণ্ডপে সিঁদুর খেলা, বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর এই দিনে হিলি সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অনুভূতিতে মিশে ছিল আনন্দ, ভালোবাসা, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের বেদনা।

ধর্মীয় উৎসবের আবহে হিলি সীমান্তের এই দৃশ্য যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, সীমারেখা ও ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের ভূখণ্ডকে আলাদা করতে পারলেও হৃদয়ের টানকে সহজে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের মানুষকে পৃথক রাখলেও আত্মীয়তার বন্ধন, ভাষার মিল, সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও মানবিক ভালোবাসা দুই বাংলার মানুষকে আজও এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। বিজয়া দশমীতে হিলি সীমান্তের এই আবেগঘন দৃশ্য তাই শুধু দুর্গোৎসবের বিদায়ের গল্প নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্কেরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর